রাহমানিয়ার চাবি আমি কেন নেবো: মাওলানা মাহমুদুল হাসান

বিগত কয়েকদিন ধরেই আলোচনায় ছিল রাজধানীর মোহাম্মদপুরের ‘জামিয়া রাহমানিয়া আরাবিয়া মাদ্রাসা’। প্রায় ২০ বছর ধরে এই মাদ্রাসাটি নিয়ে দুই পক্ষের মধ্যে দ্বন্দ্ব চলে আসছিল। এ সময় মাদ্রাসা ভবনটি ছিল শায়খুল হাদিস আজিজুল হকের পরিবারের দখলে। তাদের এই দখলকে অবৈধ দাবি করে আইনি লড়াই চালিয়ে অবশেষে বিজয়ী হয়েছে ‘জামিয়া রাহমানিয়া আরাবিয়া সাত মসজিদ মাদ্রাসা ওয়াকফ এস্টেট’।
সোমবার (১৯ জুলাই) জেলা প্রশাসনের অভিযানে আগেই মাদ্রাসায় তালা ঝুলিয়ে চলে যান   মুহতামিম ও শায়খুল হাদিস আজিজুল হকের ছেলে মাওলানা মাহফুজুল হক। এ সময় তিনি বলে যান মাদ্রাসার চাবি আল হাইয়াতুল উলিয়া লিল জামিয়াতিল কওমিয়া বাংলাদেশের চেয়ারম্যান মাহমুদুল হাসানের কাছে দিয়ে যাবেন তিনি। যদিও মাওলানা মাহমুদুল হাসান সেই চাবি রাখেননি।

সোমবার (১৯ জুলাই) সকালে মাদ্রাসার ছাত্র- শিক্ষকদের উদ্দেশে ফেসবুক লাইভে কথা বলেন মাওলানা মাহফুজুল হক। তিনি বলেন,  ‘বিভিন্ন ভাবে কথা আসতেছে যে, আমাদেরকে এ প্রতিষ্ঠান ছাড়তে হবে, এ ভবন আমাদের ছাড়তে হবে। আমরা লক্ষ্য করছিলাম— আমাদের কাছে নিয়মতান্ত্রিকভাবে কোনও নোটিশ আসেনি।  দেশের শীর্ষ আলেমরা এ বিষয়টি নিয়ে কোনও পরামর্শ করছেন না। রবিবার (১৮ জুলাই) আল  হাইআতুল উলয়ার চেয়ারম্যান ও বেফাকুল মাদারিসিল আরাবিয়ার সভাপতি মাওলানা মাহমুদুল হাসান, মুফতি রুহুল আমিন, হেফাজত মহাসচিব নূরুল ইসলাম জেহাদী, মুফতি মিজানুর রহমান সাঈদ, মুফতি এনামুল হক-সহ কয়েকজন এ বিষয়ে পরামর্শ করেছেন। আমরা জেনেছি, তারা স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে কথা বলেছেন এবং মন্ত্রী তাদের আশ্বাসও দিয়েছেন। এতে আমরা আশ্বস্ত হয়েছি, দীর্ঘদিন ধরে চলে আসা এ অবস্থার একটি চূড়ান্ত পরিণতির দিকে যাবে।’
মাহফুজুল হক আরও বলেন, ‘শীর্ষ আলেমদের পরামর্শের পর আমরাও মাদ্রাসার শিক্ষকদের নিয়ে পরামর্শ করেছি। দুপুরে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর পক্ষ থেকে আমাদের কাছে বার্তা আসে, আমরা যেন মাদ্রাসার চাবি আল  হাইআতুল উলয়ার চেয়ারম্যান মাওলানা মাহমুদুল হাসানে কাছে বুঝিয়ে দেই। চলমান অবস্থার অবসান হওয়া দরকার। ইতোমধ্যে আমাদের উপস্থিত শিক্ষক ও ছাত্ররা তাদের প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র নিয়ে আশেপাশে চলে যাচ্ছেন। আমরা অল্প সময়ের মধ্যে মাদ্রাসার সকল গেটে তালা দিয়ে শীর্ষ আলেমদের কাছে হস্তান্তর করবো। মাদ্রাসার ছাত্র-শিক্ষকরা যেন অধৈর্য না হয়ে যান।’
যদিও মাওলানা মাহফুজুল হক মাদ্রাসা ত্যাগ করার পর সেখানে উপস্থিত হয় ঢাকা জেলা প্রশাসন। তালা ভেঙে পুলিশের উপস্থিতে জেলা প্রশাসনের দায়িত্বশীল লোকেরা মাদ্রাসার ভেতরে প্রবেশ করেন।
এর আগে গত ২৯ জুন বাংলাদেশ ওয়াকফ প্রশাসন ‘জামিয়া রাহমানিয়া আরাবিয়া সাত মসজিদ মাদ্রাসা ওয়াকফ এস্টেটের’ সম্পত্তি অনুমোদিত কমিটির কাছে বুঝিয়ে দিতে ঢাকা জেলা প্রশাসককে চিঠি দেয়।
সোমবার বিকাল ৪টার দিকে মাদ্রাসা ভবনটি ‘জামিয়া রাহমানিয়া আরাবিয়া সাত মসজিদ মাদ্রাসা ওয়াকফ এস্টেট’ কমিটির কাছে বুঝিয়েন দেন জেলা প্রশাসনের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট আব্দুল আওয়াল। তিনি বলেন, ‘এটি  একটি মসজিদ ও ওয়াকফ এস্টেট। এই ওয়াকফ এস্টেটে আগে বিভিন্ন ইস্যু ছিল। কোর্টে বিভিন্ন মামলা চলমান ছিল। মামলা চলমান থাকার সুবাদে একটি পক্ষ এটার দখলে ছিল। চলতি মাসে ওয়াকফ প্রশাসনের মাধ্যমে জেলা প্রশাসনের কাছ থেকে আমরা নির্দেশ পেয়েছি যে, এখানে যারা অবৈধ দখলদার আছে, তাদেরকে উচ্ছেদ করে মাদ্রাসাটি নির্বাচিত বৈধ কমিটির কাছে দখল হস্তান্তর করার জন্য। সেই পরিপ্রেক্ষিতে আমি জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে এখানে এসেছি।  প্রথমে আমরা যখন এখানে আসলাম তখন দেখলাম, এখানে তালা ঝুলানো আছে, ভেতরে কোন লোকজনকে পাইনি। যেহেতু সব জায়গায় তালা মারা ছিল, তাই দখল ও হস্তান্তরের স্বার্থে তালা ভেঙে আমরা দায়িত্ব হস্তান্তর করেছি। ওয়াকফ এস্টেট থেকে যে কমিটি গঠন করা হয়েছে, তাদেরকে আমরা দায়িত্ব বুঝিয়ে দিয়েছি।’
মাদ্রাসা ভবনটি বুঝে পাওয়ার পর কমিটির সভাপতি ব্যবসায়ী আব্দুর রহীম বলেন, ‘আমাদের বের করে দিয়ে মাওলানা আজিজুল হক সাহেব মাদ্রাসাটি দখলে নিয়েছিলেন। আমরা কাছেই জায়গা ভাড়া করে মাদ্রাসা পরিচালনা করেছি। আর সেই সময় থেকে গত ২০ বছর ধরে আমরা আইনি লড়াই চালিয়ে এসেছি। আদালাত আমাদের কমিটিকে বৈধ ঘোষণা করেছেন। আজ জেলা প্রশাসন আমাদের ভবনটি বুঝিয়ে দিয়েছে।’ মাওলানা হিফজুর রহমান এখন মাদ্রাসাটির মুহতামিম হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন বলে জানান আব্দুর রহীম।
মাহফুজুল হকের ফেসবুকের লাইভে  মাদ্রাসার তালা চাবি মাওলানা মাহমুদুল হাসানের কাছে দিয়ে যাওয়ার কথা বলেছেন। তারপরও জেলা প্রশাসনের অভিযান নিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সরব হয়ে ওঠেন মাহফুজুল হকের অনুসারীরা। তারা বলেন, শীর্ষ আলেমদের উদ্যোগকে উপেক্ষা করে প্রশাসনের সহযোগিতায় তালা ভেঙে রাহমানিয়া দখলে নিয়েছেন মুফতি মনসুর হক। সংকট নিরসনে শীর্ষ আলেমদের উদ্যোগ এবং মাওলানা মাহফুজুল হকের প্রচেষ্টাকে বৃদ্ধাঙ্গুলি প্রদর্শন করে হিংসা-বিদ্বেষ ও সংঘাতের পথে অগ্রসর হলেন মাওলানা হিফজুর ও মুফতি মনসুর হক।
সূত্র জানায়, কয়েকজন শীর্ষ আলেম মাহফুজুল হকের অনুরোধে রাহমানিয়া মাদ্রাসা নিয়ে বৈঠকে বসেছিলেন। সেই বৈঠকে হাইয়া সভাপতি মাওলানা মাহমুদুল হাসান, মুফতি রুহুল আমিন, মুফতি মিজানুর রহমান সাঈদ ও হেফাজতে ইসলামের মহাসচিব নূরুল ইসলাম জেহাদিসহ কয়েকজন আলেম উপস্থিত ছিলেন। বৈঠকে মুফতি মনসুরুল হককে আসার অনুরোধ জানানো হলেও তিনি আসেননি। উচ্ছেদের পরিবর্তে সম্মানজনকভাবে মাদ্রাসাটি ছেড়ে দিতেই পরামর্শ দেওয়া হয় মাহফুজুল হককে।
জানা গেছে, মাওলানা মাহফুজুল হক  সকাল  ৮টার দিকে চাবি দেওয়ার কথা বললেও মাহমুদুল হাসানের কাছে চাবি যায় বিকাল নাগাদ। তবে মাদ্রাসার চাবি রাখেননি আল  হাইয়াতুল উলিয়া লিল জামিয়াতিল কওমিয়া বাংলাদেশের চেয়ারম্যান মাহমুদুল হাসান। তিনি বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন,  ‘আমি কেন চাবি নেবো। এটি আদালত ও প্রশাসনের বিষয়।’
মাহমুদুল হাসান বলেন, ‘তাদের কমিটিগত দ্বন্দ্ব অনেক আগে থেকেই। সরকার তো আমাকে এ বিষয়ে কোনও দায়িত্ব দেয়নি। আর ব্যক্তি হিসেবে আমি তো কোনোভাবেই চাবি নিতে পারি না। তবে হাইয়াতুল উলয়ার কাছে যদি দায়িত্ব দেয় তাহলে উভয় পক্ষকে আমরা মিলিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করতাম। এ কাজের জন্য সময়ও দরকার। আর আমার কাছে চাবি কেন, তারা যদিও দেয় সেটা বোর্ডের কাছে দিতে পারে। তারা শেষের দিকে চাবি নিয়ে আসছিল, কিন্তু আমার তো সেটি রাখার কোনও ভিত্তি নেই।’