ইতিকাফ : গুরুত্ব, ফজিলত ও  মাসায়েল।

মুফতী মাহমুদ হাসান।

প্রাত্যহিক জীবনের কর্মব্যস্ততার ফাঁকে ফাঁকে রাতের অন্ধকারে আল্লাহর দিকে নিবিষ্ট হয়ে একান্ত তারই এবাদত-বন্দেগিতে মনোনিবেশ করে যেভাবে তাঁর নৈকট্য অর্জনেের তাগিদ দেয়া হয়েছে, বছরে তেমনি একবার দশ দিন দশ রাতের জন্য রমজান মাসের শেষ দশকে আল্লাহর ঘরে নিজেকে বন্দি রেখে অহোরাত্র তাঁরই দ্বারে পড়়ে থাকাটাকে সুন্নত করা হয়েছে। শরীয়তের পরিভাষায় একেই ই’তিকাফ বলা হয়ে থাকে।

ইতিকাফ কি?

ইতিকাফ আরবি শব্দ ‘অকফ’ মূল ধাতু থেকে গঠিত।অকফ’ শব্দের অর্থ হলো অবস্থান করা।

লিসানুল আরবে যেমন বলা হয়েছে

لمن لازم المسجد و اقام علی العبادة فيه، عاکف و معتکف۔(لسان العرب ابن منظور : 3409)

শরয়ী পরিভাষায় যে মসজিদে পাঁচ ওয়াক্ত নামায জামাআত সহকারে নিয়মিত আদায় করা হয়,এমন মসজিদে আল্লাহর ইবাদতের উদ্দেশ্যে নিয়ত সহকারে অবস্থান করাকে ইতিকাফ বলে। সূরা বাকারার ১৮৭ নং আয়াতে আল্লাহ তায়ালা ইতিকাফের কথা উল্লেখ করেছেন৷

ই’তিকাফের গুরুত্ব ও ফজিলত-

কুরআন মাজীদে ইরশাদ হয়েছে- وَعَهِدْنَا إِلَى إِبْرَاهِيمَ وَإِسْمَاعِيلَ أَن طَهِّرَا بَيْتِيَ لِلطَّائِفِينَ وَالْعَاكِفِينَ وَالرُّكَّعِ السُّجُودِ ‘আমি ইবরাহীম ও ইসমাঈলকে আদেশ করলাম, তোমরা আমার ঘরকে [বায়তুল্লাহকে] পবিত্র কর তাওয়াফকারী, ইতিকাফকারী ও রুকু-সিজদাকারীদের জন্য।’ (সূরা বাকারা/১২৫) এই আয়াত থেকে আল্লাহ তায়া’লার কাছে ই’তেকাফের গুরুত্ব বা মর্যাদা স্পষ্ট হয়।

ই’তিকাফের ফজিলত সম্পর্কে সাহাবী ইবনে আব্বাস রা. থেকে একটি হাদীস বর্ণিত,

إن رسول الله صلى الله عليه وسلم قال في المعتكف هو يعتكف الذنوب ويجزى له من الحسنات كعامل الحسنات كلها. (مشكاة: ١/١٨٣)

অর্থ: ইতিকাফকারী সমস্ত গোনাহ থেকে নিরাপদ থাকে। নেক আমলকালীর ন্যায় সমস্ত নেক আমলের সওয়াব লাভ করে।

আরেক হাদীসে মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেন,

من اعتكف عشرا في رمضان كان كحجتين وعمرتين

(الترغيب والترهيب: ٢/٩٦)

অর্থ: “রমযানে দশদিন ইতিকাফ করলে দুটি হজ ও উমরার সওয়াব হবে”। (তারগীব-তারহীব ২/৯৬)

আমাদের সবাই তো হজ ও উমরা করার এ সৌভাগ্য অর্জন হয় না। সামর্থবান অল্প মানুষই এ সুযোগ পেয়ে থাকেন। তাই

হজ-উমরার সুযোগ না থাকলেও তার সওয়াব থেকে মাহরুম না হওয়ার অন্যতম পদ্ধতি হলো ইতিকাফ করা।

ইতিকাফে বসার বড় আরেকটি উপকার হলো, নিজেকে মসজিদে আবদ্ধ রাখার কারণে বাইরের সমস্ত গোনাহ থেকে নিরাপদ রাখা যায় । গীবত, চোগলখুরী, সমালোচনা, মানুষকে কষ্ট দেওয়া, চোখের গোনাহসহ যাবতীয় অন্যায় থেকে বিরত থাকা যায় মসজিদের নূরানী পরিবেশের উসিলায়।

এবার আসুন জেনে নিই,ইতিকাফের গুরুত্বপূর্ণ কিছু মাসয়ালা।

মাসয়ালা ১: বিশুদ্ধ মত অনুযায়ী নিয়ত করা ছাড়া ইতিকাফ সহিহ হবে না। হেদায়া ও কুদুরী।

মাসয়ালা২: বিশে রমাযান  সূর্যাস্তের পূর্বেই ইতিকাফের নির্ধারিত স্থানে অবস্থান করবে এবং ঈদুল ফিতরের চাঁদ দেখা প্রমাণিত হওয়া পর্যন্ত ইতিকাফে স্থানে বহাল থাকা থাকতে হবে।

উল্লেখ্য: সূর্যাস্তের পুর্বেই যদি ঈদের চাঁদ দেখা যায়, তাহলে সূর্যাস্ত পর্যন্ত ইতিকাফে অবস্থান করা জরুরী৷ (আনওয়ারুল মিশকাত ৩/৩৭২ পৃষ্ঠা৷ শরহে বুখারী নাসরুল বারী ৫/৬৪৩ পৃষ্ঠা৷ ইসলামী ফিকাহ ২/২১৪ পৃষ্ঠা৷ ফতোয়া ও মাসায়িল ৪/৬৬ পৃষ্ঠা৷ আহকামুস সিয়াম ৩৬ পৃষ্ঠা৷)

মাসয়ালা ৩: রমজান মাসের শেষ দশ দিন ইতিকাফ করা সুন্নতে মুয়াক্কাদা আলাল কিফায়াহ। যদি কোনো মসজিদে একজন ইতিকাফে বসেন তাহলে এলাকাবাসীর পক্ষ থেকে সুন্নত আদায় হয়ে যাবে। আর যদি কেউ ইতিকাফ না করে তাহলে ওই এলাকার সবাই সুন্নাত তরক করার জন্য গুনাহগার হবে। (বাদায়েউস সানায়ে ২/৪৪ পৃষ্ঠা৷ আহকামুস সিয়াম ৩৬ পৃষ্ঠা৷)

মাসয়ালা ৪: শুধু রমযানের শেষের তিনদিন ইতিকাফ করলে৷ এতে সুন্নতে মুয়াক্কাদাহ ইতিকাফ আদায় হবেনা৷ বরং তা নফল ইতিকাফ হিসেবে গন্য হবে৷ আর উক্ত অবস্থায় সুন্নতে মুয়াক্কাদাহ তরক করার কারনে মহল্লার সকলেই গুনাহগার হবে৷ (মুসনাদে আহমাদ ৭৭২৬ হাদীস৷(ইমদাদুল ফতোয়া ১/১৫৪ পৃষ্ঠা৷ আহকামুস সিয়াম ৩৬ পৃষ্ঠা৷)

মাসয়ালা ৫: পুরুষের  ইতিকাফ মসজিদ হওয়া আবশ্যক। পুরুষের ইতিকাফের জন্য সর্বোত্তম স্থান হলো-মাসজিদে হারাম বা বাইতুল্লাহ৷ তারপর মাসজিদে নববী৷ তারপর মাসজিদুল আকসা৷ তারপর মাসজিদুল জুমুআ৷ তারপর মাসজিদে পাঞ্জেগানা৷ আর মহিলাদের জন্য ইতিকাফের সর্বোত্তম স্থান হলো- ঘরের অন্দর মহল৷ (আশরাফুল হিদায়া ২/২৮৮ পৃষ্ঠা৷আহকামুস সিয়াম ৩৬ পৃষ্ঠা৷ আহকামুল হাদীস ৬৫২ পৃষ্ঠা৷)

মাসয়ালা ৬: ইতিকাফ একটি ইবাদত, যা বিনিময়যোগ্য নয়। বিনিময় দিয়ে বা বিনিময় নিয়ে ইতিকাফ করা বা করানো জায়েয হবেনা৷ বিনিময় দিয়ে এটা কাপ করলে সুন্নতে মুয়াক্কাদাহ আদায় হবে না।ফলে মহাল্লা বাসি সবাই গুনাগার হবে। তবে রিয়েল হাদিয়ার বিষয়টি ভিন্ন ব্যপার৷ (ফতোয়ায়ে তাতার খানিয়া ২/৩২৫ পৃষ্ঠা৷ ফতোয়ায়ে রহমানিয়া ১/৪৫৮ পৃষ্ঠা৷ আহকামুস সিয়াম ৩৬ পৃষ্ঠা৷)

মাসয়ালা ৭: মসজিদে খাবার পৌঁছে দেওয়ার মতো কেউ না থাকলে খাবার আনার জন্য আপনি বাসায় যেতে পারবেন। এ কারণে ইতিকাফ ভঙ্গ হবে না। তবে খাবার আনার জন্য মসজিদ থেকে বের হয়ে অন্য কোনো কাজে বিলম্ব করা যাবে না। অবশ্য খাবার প্রস্তুত না হলে সেজন্য অপেক্ষা করতে পারবেন। বাহরুর রায়েক ও তাবয়ীনুল হাকায়েক।

মাসয়ালা ৮: ইতিকাফরত ব্যক্তি পেশাব-পায়খানার জন্য মসজিদের বাইরে গেলে আসা যাওয়ার সময় সালাম আদান-প্রদান করতে পারবে। এ সময় কারো সাথে অল্পস্বল্প কথাও বলতে পারবে। এতে ইতিকাফের ক্ষতি হবে না। মিরকাতুল মাফাতিহ ও ফতোয়ায়ে হিন্দিয়া।

মাসয়ালা ৯: পাঞ্জেগানা মসজিদে ইতিকাফকারী জুমার নামাজ আদায় করার জন্য জামে মসজিদে যেতে পারবে। তবে নামাজ শেষে বিলম্ব না করে ফিরে আসতে হবে। ফতোয়ায়ে আলমগীরী।

মাসয়ালা ১০: ইতিকাফকারী যদি রাতে অথবা দিনে ইচ্ছাকৃত বা অনিচ্ছাকৃত সহবাস করে তাহলে ইতিকাফ বাতিল হয়ে যাবে। হেদায়া ও কুদুরী।

মাসয়ালা ১১: মহিলারা যে কক্ষে ইতিকাফ করতে চাচ্ছেন, ওই কক্ষকে আপাতত তার নামাজের ঘর হিসেবে নির্দিষ্ট করে নিতে হবে এবং ইতিকাফের পূর্ণ সময় এ ঘরেই অবস্থান করতে হবে। ফতোয়ায়ে হিন্দিয়া ও আদ্দুররুল মুখতার।

মাসয়ালা ১২: স্বামীর অনুমতি ছাড়া মহিলাদের ইতিকাফ জায়েজ হবে না। মহিলাদের মাসিক শুরু হওয়ার কারণে ইতিকাফ ভেঙ্গে যায়। ফতোয়ায়ে রহিমিয়া।

মাসয়ালা ১৩: রমযানের শেষ দশদিন ইতিকাফ করা অবস্থায় যদি কোন দিনের ইতিকাফ ভঙ্গ হয়ে যায়,তবে শুধু সে দিনের ইতিকাফ কাযা করা জরুরী হবে৷ অর্থাৎ কারো একদিনের ইতিকাফ ভঙ্গ হয়েছে, এমতাবস্থায় সে যেদিন কাযা আদায় করবে, সেদিন সূর্যাস্তের পুর্ব থেকে পরদিন সূর্যাস্ত পর্যন্ত রোযাসহ মাসজিদে ইতিকাফ করতে হবে৷

উল্লেখ- শুধু ওয়াজিব ও সুন্নত ইতিকাফের কাযা করতে হয়৷ নফল ইতিকাফের কোন কাযা করতে হয়না৷ (সহীহুল বুখারী ২০৪১ হাদীস৷ ফতোয়ায়ে শামী ৩/৪৪৪ পৃষ্ঠা৷ বাদায়েউস সানায়ে ২/২৮২ পৃষ্ঠা৷ ফাতহুল কাদীর ২/৩০৮ পৃষ্ঠা৷)

মাসয়ালা ১৪: কেহ যদি মান্নত করে যে,মাসজিদে হারামে বা মাসজিদে নববীতে কিংবা মাসজিদুল আকসায় অথবা অন্য কোন মাসজিদে ইতিকাফ করবো,তবে যে কোন মাসজিদে ইতিকাফ করলেই মান্নত পুরা হয়ে যাবে৷ (সহীহুল বুখারী ২০৩২ হাদীস৷ সুনানে আবু দাউদ ২৪৭৪ হাদীস৷

ফতোয়ায়ে আলমগীরী ১/৫১৬ পৃষ্ঠা৷ আশরাফুল হিদায়া ২/২৮৬ পৃষ্ঠা৷)

মাসয়ালা ১৫: কেহ যদি একমাস ইতিকাফ করার মান্নত করে মৃত্যু বরন করে,তবে প্রতি দিনের ইতিকাফের জন্য সদকাতুল ফিতর পরিমাণ খাদ্য বা মূল্য মিসকিনকে দেয়া ওয়াজিব হবে৷ তবে কেহ যদি অসুস্থ অবস্থায় মান্নত করে যে,যদি সুস্থ হই তবে একমাস ইতিকাফ করবো,কিন্তু সুস্থ হওয়ার পুর্বেই সে মারা গেল,তাহলে কিছুই করতে হবেনা৷ আর কারো জিম্মায় ইতিকাফের কাযা থাকলে মৃত্যুর পুর্বেই অসিয়ত করে যাওয়াও ওয়াজিব হবে৷ (সহীহুল বুখারী ২০৪৩ হাদীস৷ ফতোয়ায়ে আলমগীরী ১/৫১৬-৫১৭ পৃষ্ঠা৷ আহকামুস সিয়াম ৪৪ পৃষ্ঠা৷)

ইতিকাফ অবস্থায় যে কাজগুলো বেশি বেশি করবে:

১৷ অধিক পরিমাণে কুরআনুল কারীম তিলাওয়াত করা৷

২৷ অধিক পরিমাণে দরুদ পাঠ করা৷

৩৷ অধিক পরিমাণে তাসবীহ তাহলীল পাঠ করা৷

৪৷ অধিক পরিমাণে তাওবা ইস্তিফফার করা৷

৫৷ অধিক পরিমানে নফল নামায আদায় করা৷

(শরহে বুখারী নাসরুল বারী ৫/৬৪৩ পৃষ্ঠা৷ ফতোয়ায়ে আলমগীরী ১/৫১২ পৃষ্ঠা৷ ফতোয়া ও মাসায়িল ৪/৬৭ পৃষ্ঠা৷ আহকামুস সিয়াম ৩৭ পৃষ্ঠা৷)

মুফতী মাহমুদ হাসান।

সিনিয়র শিক্ষক, দারুল হক্ব ইসলামিয়া মাদ্রাসা মির্জাপুর, টাঙ্গাইল।