বাংলাভিশন নিউজ ২৪ এর প্রতিবেদন ও গাজী আতাউর রহমানের প্রতিবাদ

“কওমি আলেমদের সঙ্গে চরমোনাই পীরের ‘বিরোধ’ কোথায়?” শিরোনামে বাংলাভিশন নিউজ ২৪ -এ একটি প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে।
অসঙ্গতিতে ভরপুর উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ফরমায়েশি প্রতিবেদনটি করেছেন, নিয়াজ মখদুম নামের একজন অপরিপক্ক প্রতিবেদক।
বাংলাদেশের বেশিরভাগ সাংবাদিকই এখন উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ফরমায়েশি প্রতিবেদন করেন। কিন্তু তাতে কিছুটা হলেও সাংবাদিকতার নীতি অনুসরণ করে থাকেন। কিন্তু নিয়াজ মখদুম অত্যন্ত নির্লজ্জভাবে তাও করেননি। তিনি পুরাই মিথ্যা ও অনৈতিকতার আশ্রয় নিয়েছেন।
আমার উদ্বৃতি দিয়ে আমি যা বলিনি, তিনি তা লিখে দিয়েছেন। তিনি মরহুম পীর সাহেব চরমোনাই, বর্তমান পীর সাহেব হুজুর এবং শায়খে চরমোনাইকে নিয়ে উদ্দশ্যমূলক মিথ্যাচার এবং বিভ্রান্তি ছড়িয়েছেন।
তিনি দু’দিন আগে আমাকে রিং দিয়ে নায়েবে আমির
মুফতি ফয়জুল করিম সাহেবের মোবাইল নাম্বার চান।
আমি তার কাছে জানতে চাই, সে কোন বিষয়ে কথা বলতে চায়। তিনি একটি দলের নাম নিয়ে বললেন, এ বিষয়ে নায়েবে আমীরের একটি বক্তব্য ভাইরাল হয়েছে, সে বিষয়ে তিনি কথা বলবেন।
আমি জানতে চাইলাম, কবের বক্তব্য ভাইরাল হয়েছে?
তিনি বললেন, গত মাসের অর্থাৎ মার্চ মাসের। আমি বললাম, গত মাসে নায়েবে আমীর সাহেব এমন কোন বক্তব্য দেননি।
আপনি সম্ভবত আগের কোন বক্তব্য শুনেছেন। ভালভাবে যাচাই করে দেখুন!
এতটুকুই ছিল তার সঙ্গে আমার কথোপকথন।
অথচ তিনি আমার উদ্বৃতি দিয়ে লিখেছেন, আমি নাকি বলেছি ‘ এ বিষয়ে পীর সাহেব হুজুর বলতে পারবেন। আমি তাকে জানিয়ে দিব।’
কোন বিষয়ে? কওমি আলেমদের বিষয়ে? নাকি হেফাজত বিষয়ে?
এ বিষয়েতো তিনি আমার সঙ্গে কোন কথাই বলেননি।
মজার ব্যাপার হলো, যে দলের বিষয়ে তিনি আমার সঙ্গে কথা বলেছেন এবং নায়েবে আমীর সাহেবের সাথে কথা বলতে চেয়েছেন, সে দলের বিষয়ে প্রতিবেদনে কছুই উল্লেখ করেননি।
কোন সুস্থ বিবেকবান মানুষ এমন মিথ্যাচার করতে পারে! ভাবতেও অবাক লাগে।
প্রতিবেদক অত্যন্ত অসৌজন্যমূলকভাবে বললেন, মুহতারাম পীর সাহেব চরমোনাই এবং নায়েবে আমীর সাহেব -এর মোবাইলে তিনি বার বার রিং দিয়েছেন কিন্তু তারা ধরেননি।
তিনি কেমন সাংবাদিক, যার এতটুকু বোধ নেই যে, বিশিষ্ট কারো সঙ্গে কথা বলতে হলে আগে থেকে এপয়েন্টমেন্ট নিতে হয়!
বামপন্থী সেকুলার সাংবাদিকদেরওতো কিছু কর্টেসি থাকে। বাংলাভিশনের নিয়াজ মখদুমের তাও নেই।
তিনি যে বামপন্থী নন, তা তার প্রতিবেদন পড়লেই বুঝা যায়।

বামপন্থীরা সাধারণতঃ ইসলামী দল বা ইসলামপন্থী দল লেখেন না। তারা লেখেন ধর্মভিত্তিক দল। কিন্তু নিয়াজ মখদুম তার প্রতিবেদনে কয়েক জায়গায় ইসলামপন্থী ও ইসলামী দল শব্দ ব্যবহার করেছেন।
তবে নিয়াজ মখদুম তার অনভিজ্ঞতার কারণে রিপোর্টে স্ববিরোধিতাও করেছেন। তিনি এক জায়গায় বামপন্থীদের মতো রাজনীতিতে ধর্মের ব্যবহারেও আপত্তি তুলেছেন।
তিনি লিখেছেন, ‘ইসলামী আন্দোলনের বিরুদ্ধে ধর্ম অবমাননার অভিযোগ রয়েছে।
লালবাগের ইসলামী দলের এক সম্পাদক জানান, ধর্মকে রাজনীতিতে ব্যবহার করা ঠিক না। কিন্তু চরমোনাই অহরহ ধর্মকে ব্যবহার করে যাচ্ছে।’
লালবাগের ইসলামী দলকে উদ্বৃত না করে প্রতিবেদকের উচিৎ ছিল এখানে তোপখানা রোডের কোন বাম রাজনৈতিক দলকে উদ্বৃত করা।

কারণ, কোন ইসলামী দল অন্যকোন ইসলামী দলকে ধর্ম নিয়ে রাজনীতি করার দায়ে অভিযুক্ত করতে পারে না। এটা একটি চরম স্ববিরোধী এবং হাস্যকর বিষয়।
পুরা প্রতিবেদনটাই তথ্য বিভ্রাট ও অসঙ্গতিতে ভরপুর।
প্রতিবেদক লিখেছেন, ২০০১ সালে শায়খুল হাদীস বেগম জিয়ার নেতৃত্বে চারদলীয় জোটে যোগ দেয়ার পর থেকে পীর সাহেব চরমোনাই র. বিভিন্ন জনসভায় তাঁর বিরুদ্ধে বিষোদগার করেছেন।
শায়খুল হাদীস র. চারদলীয় জোটে যোগ দিয়েছেন মূলতঃ ১৯৯৯ সালে, ২০০১ সালে নয়।
আর পীর সাহেব রহ. শায়খুল হাদীস রহ. এর বিরুদ্ধে কখনো কোন বিরূপ মন্তব্য করেছেন, এর কোন প্রমান দুনিয়াতে কেউ দেখাতে পারবে না।
এসব শস্তা ননসেন্স কথা কোন সংবাদের উপজীব্য হতে পারে না।
প্রতিবেদক এক অদ্ভূত প্রক্রিয়ায় আবিষ্কার করলেন, চরমোনাইওলারা তাবলীগ জামায়াতকে অপছন্দ করে!
টঙ্গিতে তাবলীগের বিশ্ব এস্তেমার সময় নাকি চরমোনাইতে বড় মাহফিল হয়।
প্রতিবেদক বাঙ্গালীকে হাইকোর্ট দেখিয়েছেন। সবাই জানে টঙ্গীর এস্তেমা হয় প্রতিবছর জানুয়ারি মাসে আর চরমোনাই বাৎসরিক মাহফিল হয়, প্রতি বছর নভেম্ব এবং ফেব্রুয়ারি মাসের শেষে।
মুফতি সাখাওয়াত হোসেন রাজীকে উদ্বৃত করে যেসব কথা লেখা হয়েছে, তাও পক্ষপাতদুষ্ট প্রতিবেদকের মনগড়া। মুফতি সাখাওয়াতকে আমরা বিবেকবান মানুষ হিসেবে জানি। তিনি এমন উদ্ভট কথা বলতে পারেন না।
যে সময় কওমি আলেমগণের সঙ্গে পীর সাহেব চরমোনাই’র সম্পর্ক আগের যে কোন সময়ের চেয়ে চমৎকার ও ঘনিষ্ট ঠিক সে সময় কৃত্তিম ‘বিরোধ’ আবিষ্কার করে এজাতীয় ফরমায়েশি প্রতিবেদনের মতলব কী, তা আমরা ভাল করেই বুঝি।
কওমি আলেমদেরকে অতীতে বারবার বিভ্রান্ত করা হয়েছে। এখনো সে ঘৃণ্য প্রচেষ্টা থেমে নেই।
তবে অনেক ঘাত প্রতিঘাত পেরিয়ে কওমি অঙ্গণ এখন অনেক সচেতন।
নিয়াজ মখদুমদের মতলব এখন তাদেরও বুঝতে বাকি নেই।
বিঃ দঃ এ বিষয়ে আমার লেখার ইচ্ছা ছিল না। প্রতিবেদকের ব্যাপারে তার হাউজে সতর্ক করতে আমাদের মিডিয়া উপকমিটির দায়িত্বশীলকে নির্দেশনা দিয়েছিলাম।
কিন্তু বিস্ময়ের সঙ্গে লক্ষ করলাম, আমাদের স্বজাতি কিছু ভাই, যারা ইসলামী আন্দোলনের বিরোধিতায় অন্ধ; তারা এমন একটি উদ্দেশ্যপূর্ণ ভাতৃঘাতি রিপোর্ট নিয়েও ট্রল করা শুরু করেছে।
এরা এদেশে ইসলামী শক্তির বৃহত্তর স্বার্থ চিন্তা করে না বরং এরা সবসময় সঙ্কীর্ণ কোটারী চিন্তায় নিজের লেজ নিজেরা কামড়ায়।

গাজী আতাউর রহমান, যুগ্মমহাসচিব, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ

বাংলাভিশন নিউজ ২৪ এর প্রতিবেদনঃ

কওমি আলেমদের সংগে চরমোনাই পীরের ‘বিরোধ’ কোথায়?

জামায়াতে ইসলামীসহ দেশের ইসলামপন্থী অন্য দলগুলোর সংগে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের প্রকাশ্য-অপ্রকাশ্য দ্বন্দ্ব রয়েছে। কওমি জগতের প্রখ্যাত শায়খুল হাদিস আল্লামা আজিজুল হক, মুফতি ফজলুল হক আমিনি, বায়তুল মোকাররমের খতিব উবায়দুল হক এবং মাসিক মদীনার সম্পাদক মাওলানা মহিউদ্দিন খানের সংগেও ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠাতা আমীর মরহুম ফজলুল করিম চরমোনাই-এর বিরোধ ছিলো বলে জানা যায়।
২০০১ সালে শায়খুল হাদিস আজিজুল হক বিএনপি নেতৃত্বাধীন চারদলীয় জোটে যোগ দেওয়ায় একাধিক সভা-সমাবেশে তাঁকে বিষোদগার করে বক্তৃতা দিয়েছিলেন চরমোনাই পীর। তখন থেকেই কওমি মাদ্রাসাকেন্দ্রিক ইসলামী দলগুলোর সংগে দূরত্ব সৃষ্টি হয় চরমোনাইয়ের।

ফজলুল করীমের সময়ে দেশের ইসলামী দল ও কওমি আলেমদের সংগে সম্পর্কের যে অবনতি হয়েছিলো তার উন্নতি ঘটাতে পারেনি বর্তমান আমির রেজাউল করীম ও তার ভাইয়েরা। দিন দিন তাদের সম্পর্কের আরো অবনতি হচ্ছে।
হাটহাজারী মাদ্রাসার হেফাজত নেতারা জানান, হেফাজতে ইসলাম প্রতিষ্ঠার আগে যে প্রক্রিয়ায় বৈঠক হয়েছিলো সেখানে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশকে ডাকা হয়েছিলো। তখন হেফাজতের সংগে দেশের সিংহভাগ ইসলামী দল একাত্মতা পোষণ করলেও হেফাজতকে সমর্থন করেনি ইসলামী আন্দোলন। দলের আমির মুফতি রেজাউল করিম, তখন মাওলানা ফরিদ উদ্দিন মাসউদদের মত পরোক্ষভাবে হেফাজতে ইসলামের বিরুদ্ধে কাজ করেছিলেন। অভিযোগ রয়েছে, বিভিন্ন বৈঠক বা ইস্যুতে আন্দোলনের কর্মসূচি ও নেতৃত্ব নিয়ে তাঁরা বিতর্কিত বক্তব্য দিতে থাকেন তখন।

গত ১৪ এপ্রিল সন্ধ্যায় হেফাজতের সহকারী মহাসচিব সাখাওয়াত হোসাইন রাজী গ্রেফতার হন। গ্রেফতার হওয়ার কিছুক্ষণ আগে তিনি বাংলাভিশন ডিজিটালকে বলেন, হেফাজতে ইসলাম ২০১৩ সালের ৫ মে মতিঝিলের শাপলা চত্বরে বৃহৎ সমাবেশের ডাক দেয়। তার ঠিক কিছুদিন আগে শাপলা চত্বরে চরমোনাই একটি বড় সমাবেশের আয়োজন করে, যা কওমি আলেম ও হেফাজতের সংগে তাঁদের দূরত্ব আরো বাড়িয়ে দেয়।

তিনি বলেন, কওমীর মুরুব্বী আলেমরা দাবি করেন, নিজেদের হকপন্থী দাবি করলেও হকপন্থী যে কোনো আন্দোলনে চরমোনাই হট্টগোল লাগিয়ে অতিথি পাখির মতো চলে যায়।

কওমি আলেমদের অভিযোগ, চরমোনাই পীরের দল ‘তাবলীগ জামায়াত’ অপছন্দ করতো। যখন টঙ্গীতে তাবলীগের ইজতেমা হতো ঠিক ওই সময় তারা পরিকল্পিতভাবে বরিশালে বাৎসরিক মাহফিল করতো। যার কারণে কওমি আলেমদের একটি বড় অংশ তাঁদের পছন্দ করেন না। এসব কারণেই তাদের হেফাজতের কমিটি থেকেও দূরে রাখা হয়েছে।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে মামুনুল হকের বড় ভাই হেফাজতে ইসলামের নায়েবে আমীর মাওলানা মাহফুজুল হক বলেন, মুরুব্বীরা হেফাজতের দায়িত্বশীল বাছাই করেছেন। কাদেরকে রাখা হয়নি, কাদেরকে রাখা উচিত ছিলো এ ব্যাপারে কথা বলার এখতিয়ার আমার নেই।

ইসলামী ঐক্যজোটের এক নেতা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, চরমোনাই পীরের নেতৃত্বাধীন ইসলামী আন্দোলন রাজনীতির মাঠে নিজেদের আওয়ামী লীগ-বিএনপি বিরোধী ‘স্বতন্ত্র’ রাজনৈতিক শক্তি দাবী করলেও ধারণা করা হয়, তারা আওয়ামী লীগের কাছ থেকে সুবিধা নিয়ে থাকে। এ কারণেই হয়তো চরমোনাই পীরপন্থীদের হেফাজতের কমিটিতে না রাখা হয় না।
চরমোনাইর দল ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের বিরুদ্ধে ধর্ম অবমাননারও অভিযোগ রয়েছে। লালবাগে ইসলামী দলের এক সম্পাদক জানান, ধর্মকে রাজনীতিতে ব্যবহার করা ঠিক না। কিন্তু চরমোনাই অহরহ ধর্মকে ব্যবহার করে যাচ্ছে। কিন্তু তাঁদের বিরুদ্ধে কেউ ধর্ম অবমাননার অভিযোগ আনেন না। বরিশালে গত মেয়র নির্বাচনের ক্যাম্পেইনে তাঁরা দাবি করতো, হাতপাখায় ভোট দিলে নবীকে ভোট দেয়া হবে। এটা এক ধরণের ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত করার শামিল। তাঁদের বিরুদ্ধে এসব অভিযোগ থাকলেও সরকারের সহানুভূতি থাকায় সবসময়ই তাঁরা পার পেয়ে যান।
ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ-এর আমির রেজাউল করীমকে ফোন দিলে পাওয়া যায়নি। তাঁর মুখপাত্র গাজী আতাউর রহমান বলেন, এ বিষয়ে পীর সাহেব হুজুর বলতে পারবেন। আমি তাঁকে জানিয়ে দিবো।
পরে চরমোনাই পীর ও ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের নায়েবে আমির মুফতি ফয়জুল করীমের মোবাইল ফোনে বার বার কল করা হলেও তিনি রিসিভ করেননি।

নিয়াজ মখদুম, সাংবাদিক, বাংলা ভিশন নিউজ ২৪