মাওলানা মামুনুল হকসহ হেফাজতের শীর্ষ নেতাদের ধরতে প্রধানমন্ত্রীর অনুমতি চেয়েছে পুলিশ

আলোচিত হেফাজতে ইসলামের একাধিক শীর্ষ নেতাকে গ্রেপ্তার করতে প্রধানমন্ত্রীর সায় চেয়েছে পুলিশ। যেসব নেতার বিরুদ্ধে  দেশের বিভিন্ন থানায় মামলা আছে তাদের তালিকা করেছে পুলিশ সদর দপ্তর। ইতোমধ্যে তালিকাটি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় হয়ে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে পাঠানো হয়েছে। পুলিশ বলছে, তাদের গ্রেপ্তার করতে প্রধানমন্ত্রীর সম্মতির অপেক্ষায় রয়েছে তারা। এদিকে ২০১৩ সালের ৫ মে হেফাজতের তান্ডবের ঘটনায় ঢাকাসহ সারা দেশে যেসব মামলা হয়েছিল সেগুলো দ্রুত নিষ্পত্তি করতে পুলিশকে বিশেষ নির্দেশনা দিয়েছে পুলিশ সদর দপ্তর। নির্দেশনা পেয়ে পুলিশের বিভিন্ন ইউনিট কাজও শুরু করে দিয়েছে। এরই অংশ হিসেবে হেফাজতের শীর্ষ নেতা মামুনুল হকের বিরুদ্ধে ঢাকা ও সোনারগাঁয়ে মামলা হয়েছে বলে পুুলিশের একটি সূত্র নিশ্চিত করেছে। তাছাড়া তালিকাভুক্ত হেফাজত নেতাদের নজরদারির আওতায় আনা হয়েছে।

প্রতিবেদনে আরও জানা যায় পুলিশের একাধিক কর্মকর্তা  জানান, ২০১৩ সালে তান্ডবের ঘটনায় হেফাজতের তৎকালীন মহাসচিব জুনায়েদ বাবুনগরী, জমিয়তে উলামায়ে ইসলামের মহাসচিব মুফতি ওয়াক্কাস, বিএনপি-জামায়াতসহ কয়েকটি রাজনৈতিক দলের নেতাসহ ৮৮ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল। পরে তারা জামিনে মুক্তি পান। আর বাকিরা জামিন ছাড়াই অবাধে চলাফেরা করছেন। যারা জামিন নিয়ে তান্ডবে অংশ নিয়েছিল বা ইন্ধন জুগিয়েছে তাদের জামিন বাতিল করতে আদালতে আবেদন করা হবে। ওই সময় ঢাকাসহ ৭টি জেলায় ৮৩টি মামলা হয়। এসব মামলায় ৩ হাজার ৪১৬ জনের নামসহ ৮৪ হাজার ৯৭৬ জনকে আসামি করা হয়। আর মোদিবিরোধী বিক্ষোভকে কেন্দ্র করে তান্ডবের ঘটনায় ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ, চট্টগ্রাম ও ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় ৪৫টি মামলা হয়েছে। মামলাগুলোতে আসামির সংখ্যা ২৭ হাজার।
জানতে চাইলে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান বলেন, সম্প্রতি দেশের কয়েকটি স্থানে হেফাজত যেভাবে তান্ডব চালিয়েছে তারা ক্ষমার অযোগ্য। ইতোমধ্যে তান্ডবকারীদের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে। মামলার তদন্ত চলছে। তদন্তে যাদের নাম আসবে তাদের আইনের আওতায় আনা হবেই। কাউকে ছাড় দেওয়ার কোনো সুযোগ নেই। তারা যাতে আর কোনো নাশকতা চালাতে না পারে সেই জন্য কঠোর নজরদারি করা হচ্ছে।

পুলিশ সদর দপ্তরের অতিরিক্ত ডিআইজি পদমর্যাদার এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করে গতকাল  বলেন, হেফাজতের তান্ডবের সঙ্গে শীর্ষ নেতাদের ইন্ধন থাকার প্রমাণ মিলেছে। যারা এসব অপকর্ম করেছে তাদের একটি তালিকা করা হয়েছে। ওই তালিকাটি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে। মন্ত্রণালয় থেকে তালিকাটি প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে আছে। আমরা প্রধানমন্ত্রীর সিগন্যালের অপেক্ষায় আছি। ওই কর্মকর্তা আরও বলেন, শাপলা চত্বরসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে থাকা মামলাগুলো দ্রুত নিষ্পত্তি করতে পুলিশের বিভিন্ন ইউনিটকে নতুন করে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। ওইসব মামলায় হেফাজতের শীর্ষ নেতাদের আসামি করা হয়েছিল। তালিকাভুক্ত নেতাদের নজরদারি করা হচ্ছে। তারা কোথায় যাচ্ছেন বা কী করছেন তা পর্যবেক্ষণের আওতায় এসেছেন। হেফাজতের শীর্ষ নেতা মামুনুল সোনারগাঁয়ে যেই অনৈতিক কাজ করেছেন তাতেই তিনি ফেঁসে যাচ্ছেন। তাকে গ্রেপ্তার করতে পুলিশ কাজ করছে। তিনি আত্মগোপনে থেকে মাঝেমধ্যে ফেইসবুকে লাইভে আসছেন।

ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেদ্র মোদির বাংলাদেশ সফরকে কেন্দ্র করে হেফাজত ঢাকা, চট্টগ্রাম ও ব্রাহ্মণবাড়িয়াসহ কয়েকটি জেলায় ব্যাপক তান্ডব চালায়। বিশেষ করে চট্টগ্রামের হাটহাজারী ও ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় নারকীয় তান্ডব চালায় তারা। এসব তান্ডবের সঙ্গে সরাসরি জড়িত ও ইন্ধনদাতাদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দিয়েছে হাইকমান্ড। তাছাড়া ২০০৫ সালের ১৩ মে শাপলা চত্বর ঘেরাওয়ের নামে ব্যাপক তান্ডব চালানোর পর ঝুলে থাকা মামলাগুলোর বিষয়েও বিশেষ বার্তা দেওয়া হয়েছে। ইতিমধ্যে সরকারের মন্ত্রী ও আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতা ঘোষণা দিয়েছেন হেফাজতকে আর কোনো ধরনের ছাড় দেওয়া হবে না। গত মঙ্গলবার স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে আইনশৃঙ্খলা সংক্রান্ত একটি বৈঠক হয়েছে। বৈঠকে আইজিপিসহ পুলিশ, র‌্যাব ও বিভিন্ন সংস্থার শীর্ষ কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। বৈঠকে হেফাজতের তান্ডব নিয়ে বিশদ আলোচনা হয়েছে বলে বৈঠকে উপস্থিত থাকা মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা জানান। তিনি বলেন, ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় এমন কোনো স্থান নেই যেখানে তারা হামলা চালায়নি। ওইসব হামলার সঙ্গে হেফাজতের শীর্ষ নেতাদের ইন্ধন আছে। কাদের কাদের ইন্ধন ছিল তা নিয়েও বৈঠকে আলোচনা হয়েছে। তিনি আরও বলেন, হেফাজত নেতাদের বিরুদ্ধে ঝুলে থাকা মামলাগুলো আবার সচল করা হচ্ছে। মামলাগুলো দ্রুত সময়ের মধ্যে তদন্তের পর অভিযোগপত্র দিতে বলা হয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর সম্মতি আসার পরই শীর্ষ নেতারা গ্রেপ্তারের আওতায় চলে আসবেন। তবে যারা জামিনে আছেন তাদের কাউকে হয়রানি করা হবে না। বাংলাদেশের স্বাধীনতার ৫০ বছর পূর্তি ও বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবার্ষিকীর দিনে এমন নৈরাজ্যের রহস্য উদঘাটনেও কাজ করছে পুলিশসহ সবকটি সংস্থা।

ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ কমিশনার মোহা. সফিকুল ইসলাম জানান, ঝুলে থাকা হেফাজতের মামলাগুলো দ্রুত নিষ্পত্তি করে চার্জশিট দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। হেফাজত নেতা মামুনুলসহ যাদের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে তাদের বিষয়ে তদন্ত শুরু হয়েছে। যারা অপরাধ করবে তাদের আইনের আওতায় আনা হবেই। কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না।

গত রবিবার জাতীয় সংসদে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী তান্ডবকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর বার্তা দিয়েছেন। আইজিপি, র‌্যাব মহাপরিচালক ও এসবির প্রধান ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত স্থান পরিদর্শন করে প্রশাসনের শীর্ষ কর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করেছেন। পুলিশ সদর দপ্তরে আইজিপির সভাপতিত্বে একাধিক বৈঠক হয়েছে। গতকালও আইজিপি একটি সংস্থার শীর্ষ কর্মকর্তার সঙ্গে একা বৈঠক করেছেন।

সোমবার রাজধানীর পল্টন থানায় হেফাজতের শীর্ষ নেতা মামুনুল হকের বিরুদ্ধে তান্ডব চালানোর মামলা হয়েছে। গতকাল নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁ থানায় আরেকটি মামলা হয়েছে। ওইসব মামলা থানা পুলিশের পাশাপাশি পুুলিশের বিভিন্ন ইউনিট ছায়াতদন্ত শুরু করেছে। যেকোনো সময় মামুনুলকে গ্রেপ্তার করার ইঙ্গিত পাওয়া গেছে। গতকাল নেত্রকোনা থেকে শিশুবক্তা হিসেবে পরিচিত রফিকুল ইসলাম মাদানীকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তার সঙ্গে হেফাজতের শীর্ষ নেতাদের নিয়মিত যোগাযোগের তথ্য পেয়েছে আইনপ্রয়োগকারী সংস্থাগুলো। সামনের দিনগুলোতে হেফাজত যাতে আর কোনো ধরনের হামলা-ভাঙচুর বা আন্দোলন করতে না পারে সেজন্য আইনপ্রয়োগকারী সংস্থাগুলোকে বিশেষ বার্তা দিয়েছে সরকার। কওমিসহ সব মাদ্র্রাসা বন্ধ করার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। তারপরও হেফাজতের নিয়ন্ত্রণাধীন মাদ্রাসাগুলোর ওপর দৃষ্টি রেখেছে গোয়েন্দারা।

ঢাকা মহানগর পুলিশের মতিঝিল ডিভিশনের উপপুলিশ কমিশনার সৈয়দ নূরুল ইসলাম  বলেন, ‘বায়তুল মোকাররমে হামলায় ওইদিন যারা প্রকাশ্যে ছিলেন এবং নেপথ্যে থেকে যারা নির্দেশনা দিয়েছেন তাদের ব্যাপারে অনুসন্ধান চলছে। জড়িতদের আটকে অভিযান চলছে। এজাহারে যারা আছেন তাদের অনেকেরই রাজনৈতিক পরিচয় পাওয়া গেছে।

হেফাজতের শীর্ষ নেতা মামুনুলের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে। হেফাজতের পুরনো মামলাগুলোও তদন্ত চলছে।’ তিনি আরও বলেন, ‘গত ২৬ মার্চ মামলার আসামিরা কোথায় ছিল, বায়তুল মোকাররমে সরাসরি উপস্থিত ছিল কি না, তারা নাশকতার নির্দেশ-উসকানি দিয়েছে কি না, হামলার অর্থদাতা বা মাস্টারমাইন্ড কি না তা শনাক্ত করে তাদের গ্রেপ্তারসহ সব ধরনের ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একটি সংস্থার এক কর্মকর্তা বলেন, গত ৩ এপ্রিল সোনারগাঁ রয়েল রিসোর্টে নারীসহ হেফাজত নেতা মামুনুল হক অবরুদ্ধের ঘটনায় তারা ফের মাঠ গরমের চেষ্টা চালাচ্ছে বলে আমরা তথ্য পেয়েছি। তবে তারা আর সুবিধা করতে পারবে না। আমাদের কাছে থাকা প্রমাণ এবং ফাঁস হওয়া একাধিক অডিও কল রেকর্ডের কারণে হেফাজত নেতারা সুবিধা করতে পারছে না। ডিএমপির এক কর্মকর্তা বলেন, ২০১৩ সালের ৫ মে তাণ্ডবের পর ঢাকাসহ সাতটি জেলায় ৮৩টি মামলা হয়।

এসব মামলায় ৩ হাজার ৪১৬ জনের নামসহ ৮৪ হাজার ৯৭৬ জনকে আসামি করা হয়। বাগেরহাটের একটি মামলার বিচার শেষ হলেও রায়ে সব আসামি খালাস পায়। দুটি মামলার অভিযোগ প্রমাণ করতে না পেরে চূড়ান্ত প্রতিবেদন দেওয়া হয়। ১৮টি মামলার অভিযোগপত্র দিলেও বিচার শুরু হয়নি।

তিনি আরও বলেন, ২৬ মার্চ থেকে শুরু হওয়া হেফাজতের তান্ডবের ঘটনার পর সরকার কঠোর অবস্থানে গিয়েছে। ঝুলে থাকা মামলাগুলোর পাশাপাশি সম্প্রতি যেসব মামলা হয়েছে সেগুলোর তদন্ত শেষ করতে সরকারের হাইকমান্ড থেকে নির্দেশনা এসেছে। দেশের বিভিন্ন থানায় নির্দেশনা দিয়েছে পুলিশ সদর দপ্তর।

 

সূত্র: দেশ রুপান্তর। প্রতিবেদনটি লিখেছেন সরোয়ার আলম