গোপনে দুই বছর আগেই বিয়ে করেছেন রফিকুল ইসলাম মাদানী

সাখাওয়াত কাওসার: রাষ্ট্রবিরোধী ও উসকানিমূলক কথাবার্তা এবং রাষ্ট্রের শীর্ষ ব্যক্তিদের নিয়ে কটাক্ষ করার অভিযোগে ইসলামি বক্তা হিসেবে পরিচিত রফিকুল ইসলাম মাদানীকে আটক করেছে র‌্যাব।

আজ বুধবার ভোরে নেত্রকোনা পূর্বধলা উপজেলার লেটিরকান্দার নিজ বাড়ি থেকে তাকে আটক করা হয়।
র‌্যাবের আইন ও গণমাধ্যম শাখার পরিচালক কমান্ডার খন্দকার আল মঈন বিষয়টি নিশ্চিত করে বলেন, তার বিরুদ্ধে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে মামলা দায়েরের প্রস্তুতি চলছে।

তদন্ত সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, সম্প্রতি রফিকুল ইসলাম তার এক বক্তৃতায় বলেছিলেন, ‘‘রাষ্ট্রপতি মানি, যদি সে ইসলাম মানে। প্রধানমন্ত্রী মানি, যদি সে ইসলাম মানে। এই কচুর প্রধানমন্ত্রী মানি না যদি সে ইসলামের বিরুদ্ধে যায়।’’ এখনো ইউটিউবসহ বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে তার এই বক্তব্যসহ আরও অনেক উস্কানিমূলক বক্তব্য সরকারের ভিতরে এবং বাইরে নানা প্রতিক্রিয়ার জন্ম দেয়।

সূত্র মতে, র‌্যাবের হাতে আটকের পর প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদেই রফিকুল জানিয়েছেন, ‘স্যার আমার হুঁশ ছিল না। জোসের কারণে বলে ফেলেছি।

বেহুঁশে থাকলে অনেকে তো অনেক কিছুই বলে ফেলে।’ তবে দফায় দফায় রফিকুল ইসলামের আকুতি ছিল, ভবিষ্যতে তিনি আর এমনটা করবেন না। তার বিরুদ্ধে গাজীপুর মহানগর পুলিশের গাছা থানায় মামলা দায়েরের প্রস্তুতি চলছে। একইসঙ্গে মামলাটির তদন্তভার র‌্যাবে রাখতে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে আবেদন করবে র‌্যাব।

দুই বছর আগেই বিয়ে করেছেন রফিকুল:
গত মঙ্গলবার তিনি ময়মনসিংহ হালুয়াঘাটের ফুলপুরের রহিমগঞ্জে কনে দেখতে গিয়েছিলেন রফিকুল। কনের নাম আসমা আক্তার। তবে পাত্রীর বাবা-মা’র পছন্দ হয়নি রফিকুলকে। তবে পিলে চমকে উঠা তথ্য হলো, মাওলানা রফিকুল গত ২০১৯ সালের শেষের দিকে হালুয়াঘাটের সেই পাত্রী আসমা আক্তারকেই গোপনে বিয়ে করে ফেলেছেন। আসমা আক্তার তার বড় ভাইয়ের স্ত্রী পারভীন আক্তারের চাচাতো বোন। ওই গোপন বিয়ের অন্যতম একজন স্বাক্ষী ছিলেন পারভীন। রফিকুল এবং আসমার ওই বিয়েরও কোন রেজিষ্ট্রি হয়নি। মঙ্গলবার আনুষ্ঠানিকভাবে বিয়ের জন্য আসমাকে দেখতে গিয়ে ব্যর্থ হয়ে ফিরে আসার পর ফেসবুক মেসেঞ্জারে আসমাকে তিনি লিখেছেন, ‘প্রয়োজনে ১০ বছর অপেক্ষা করবেন। তবুও তিনি তাকেই আনুষ্ঠানিকভাবে বিয়ে করবেন।’
জানা গেছে, রফিকুল ইসলাম মাদানীরা পাঁচ ভাই। রফিকুল সবার ছোট। তার বাবা মৃত শাহাবুদ্দিন। মাদানী নেত্রকোনার মালনী এলাকায় জামিয়া ইসলামিয়া হুসাইনিয়া মাদ্রাসায় অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত পড়ে ঢাকায় চলে আসেন। সেখানে লেখাপড়া করার সময় ‘শিশু বক্তা’ হিসেবে আলোচিত হন।
শিশু বক্তা না ডাকতে আপত্তি রফিকুলের:
ইউটিউবে তার কয়েকটি ওয়াজের ভিডিওতে দেখা যায়, রফিকুল তার নামের সাথে ‘শিশু বক্তা’ যোগ করার প্রতিবাদ করেন এবং নিজেকে প্রাপ্ত বয়স্ক হিসেবে দাবি করেন। র‌্যাবের কাস্টডিতে ও তিনি তার প্রকৃত বয়স ২৬ বলে দাবি করেছেন। ফেসবুক ও ইউটিউবে তার যেসব ছবি ও ভিডিও আছে, তা বিশ্লেষণ করে দেখা যাচ্ছে, কণ্ঠ, শারীরিক গঠন ও মুখাবয়বের কারণে তাকে কম বয়েসী ছেলেদের মত মনে হয়।

আমাদের নেত্রকোনা প্রতিনিধি জানিয়েছেন, গতকাল বিকালে নেত্রকোনা জেলা প্রেসক্লাব ক্যান্টিনে বাংলাদেশ হেফাজত ইসলাম নেত্রকোনা জেলা শাখা ও তার পরিবারবর্গে একটি সংবাদ সম্মেলন করে তার মুক্তির দাবি করেছেন।

রফিকুল ইসলামের বড় ভাই রমজান মিয়া বলেন, রফিকুল মঙ্গলবার রাতে ময়মনসিংহের হালুয়াঘাটে ধর্মীয় সভা করে বাড়িতে আসেন। রাতের খাবার শেষে সবাই ঘুমিয়ে গেলে রাত আড়াইটার দিকে র‌্যাব পরিচয়ে কিছু লোক প্রায় ১৯টি গাড়ি নিয়ে তাদের বাড়ি ঘেরাও করে। সেখান থেকে রফিকুল ইসলাম মাদানী, তার বড় ভাই বকুল মিয়া (৩৭) ও তার দূর সম্পর্কের ভাতিজা এনামুল হককে (২৮) তুলে নিয়ে যাওয়া হয়। পরে বকুল মিয়াকে রাতেই ছেড়ে দেওয়া হলেও অন্য দু’জনের খোঁজ তাদের জানা নেই।

তিনি দাবি করেন, রফিকুল ইসলাম মাদানীর ব্যবহৃত দুটি মুঠোফোনসহ তাদের পরিবারের ছয়টি মুঠোফোন জব্দ করে নিয়ে যায় আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা।
সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশ হেফাজত ইসলাম কেন্দ্রীয় কমিটি ও জেলার শাখার সদস্য মাওলানা আব্দুল কাইয়ুম, রফিকুল ইসলামের চাচাতো ভাই নজরুল ইসলাম, বড় ভাই রমজান মিয়াসহ জেলা হেফাজত ইসলামের নেতৃবৃন্দ।

হেফাজত নেতৃবৃন্দ বলেছেন, তাকে দ্রুত মুক্তি না দেওয়া হলে হেফাজতের কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্দের সঙ্গে আলোচনা করে কঠোর কর্মসূচি দেওয়া হবে। রফিকুল ইসলাম তাদের কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য।

হেফাজতে ইসলামের প্রতিবাদ:
রফিকুল ইসলামকে আটকের পর তার মুক্তি দাবি করে বিবৃতি দিয়েছেন হেফাজতে ইসলামের সাংগঠনিক সম্পাদক আজিজুল হক। বিবৃতিতে লেখা হয়, রফিকুল ইসলাম তার ওয়াজের মাধ্যমে ‘দেশের প্রতি ভালোবাসার তাগিদে’ সাধারণ মানুষকে ‘অন্যায়, জুলুম ও অত্যাচারের বিরুদ্ধে জাগ্রত হওয়ার আহ্বান’ করেন।

বিবৃতিতে রফিকুল ইসলামের মুক্তি দাবি করে অভিযোগ তোলা হয়, যে দেশের প্রচলিত আইন অনুসরণ করে তাকে আইনের আওতায় আনা হয়নি।

সূএ: বাংলাদেশ প্রতিদিন