ওয়ায়েজিনদের প্রতি মাওলানা আতাউল্লাহ হাফেজ্জীর আহ্বান

ইসলামী জার্নাল : বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলন প্রধান আমীরে শরীয়ত মাওলানা ক্বারী শাহ আতাউল্লাহ ইবনে হাফেজ্জী হুজুর ভারতীয় লেখক ডা. কালিদাস বৈদ্যের লেখা “বাঙালির মুক্তিযুদ্ধে অন্তরালের শেখ মুজিব” নামে বইটির তীব্র সমালোচনা করেছেন। তিনি বলেছেন, এই বইটি দেশে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি নষ্ট করতে পারে এবং সামাজিক বিশৃংখলা সৃষ্টি করতে পারে।
বইটির বিরুদ্ধে সংসদে নিন্দা প্রস্তাব পাস করার দাবি জানিয়েছেন তিনি। মাওলানা শাহ আতাউল্লাহ এই বইয়ের বিভিন্ন লেখার জবাবে কোরআন হাদিসের দলিল উল্লেখ করে “কুরআনের ওপর ডা. কালিদাস বৈদ্য আরোপিত অপবাদের জবাব” শিরোণামে একটি পুস্তিকা লিখেছেন।
তাতে তিনি উল্লেখ করেছেন, ১৯৭১ সালের বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য কী ছিল, শেখ মুজিবুুর রহমান কী চেয়েছিলেন, এ বিষয়ে বই লিখতে গিয়ে শেখ মুজিবুর রহমানের রাজনৈতিক পরামর্শদাতা দাবীদার ভারতীয় লেখক ডাঃ কালিদাস বৈদ্য “বাঙালির মুক্তিযুদ্ধে অন্তরালের শেখ মুজিব” নামে একটি বই লিখেছেন।
এ বইয়ে সূরা তাওবার ৫নং আয়াত, সূরা নিসার ৮৯ নং আয়াত, সূরা আনফালের ৩৯ নং আয়াত, সূরা মুহাম্মদের ৪নং আয়াতের অপব্যাখ্যা করে বলেছেন যে, ১৯৭১ সালে স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় এদেশের মুসলমানরা আল্লাহর হুকুম হিসেবে এই আয়াতগুলি তামীল করতে গিয়ে ত্রিশ লক্ষ হিন্দুকে হত্যা করেছে, হিন্দুদের বাড়ীঘর লুণ্ঠনের পর তা জ্বালিয়ে দিয়েছে, হিন্দু নারীদের নির্যাতনের পর ধর্ষণ করেছে- যা সম্পূর্ণ মিথ্যা, বিভ্রান্তিকর। ১৯৭১ সালে স্বাধীনতা যুদ্ধে ত্রিশ লক্ষ হিন্দু হত্যা হয়নি, পবিত্র কুরআনের আয়াতের দোহাই দিয়ে কোনো হিন্দু নারীকে ধর্ষণ করা হয়নি বা হিন্দুদের বাড়িঘর লুণ্ঠনের পর তা জ্বালিয়ে দেয়া হয়নি। এসব কাজ ইসলামের দৃষ্টিতে সম্পূর্ণ হারাম। কোরআনের আয়াত ১৯৭১ সালে হিন্দুদের হত্যা, তাদের বাড়িঘর লুণ্ঠন বা হিন্দু নারীদের ধর্ষণের জন্য নাযিল হয়নি।
শাহ আতাউল্লাহ বলেছেন, ডাঃ কালিদাস বৈদ্য তার বইয়ের ৫৪ নং পৃষ্ঠায় লিখেছেন,‘শিক্ষাদীক্ষায় মুসলমানদের অনীহার কারণও ইসলামের শিক্ষা। শিক্ষাদীক্ষা ও নৈতিক দিক দিয়ে উন্নত সৎ মানুষ গড়ার কোনো প্রেরণা ইসলামে নেই। ইসলাম মানুষকে সম্পদ সৃষ্টিতে কোন প্রেরণা যোগায় না। ইসলামের শিক্ষা হল জেহাদ করে পরের সম্পদ ঘরে আনতে হবে।
চুরি, ডাকাতিতেই ইসলামের প্রেরণা। ইসলামি মতে ইসলাম হল শ্রেষ্ঠ পথ। এই পথের পথিক বলে একজন মুসলমান পাহাড় প্রমাণ পাপ করলেও সৃষ্টিকর্তার ক্ষমা পাবে। পরলোকে জান্নাত (স্বর্গ) বাসী হবে।”
বইয়ের ৫৫ পৃষ্ঠায় তিনি লিখেছেন, “জেহাদের সারকথা হল, বিধর্মীদের আক্রমণ কর, খুন কর, শূলবিদ্ধ কর, হাত পা কেটে দাও। তবে মুসলমান হতে রাজি হলে ক্ষমা করে দিও। অন্যথায় তাদের ঘরবাড়ি লুট কর, জ্বালিয়ে দাও। তাদের মেয়েদের উপর অত্যাচার চালাও। এইভাবে এক ভয়াবহ সন্ত্রাসের পরিস্থিতি তৈরি কর, যা দেখে বা শুনে অন্যরা ভয় পেয়ে মুসলমান হয়।”
মাওলানা শাহ আতাউল্লাহ আরো বলেছেন, ডা. কালিদাস বৈদ্যের “বাঙালির মুক্তিযুদ্ধে অন্তরালের শেখ মুজিব” বইয়ের কারণে দেশে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি নষ্ট, সামাজিক বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি বা রাজনৈতিক স্থীতিশীলতা নষ্ট হতে পারে। বইটি নিজ দায়িত্বে সংগ্রহ করে প্রত্যেক বিবেকবান মানুুুুুুষের পড়া উচিৎ। বিশেষ করে প্রধানমন্ত্রীর নিজেরও পড়া উচিৎ, মন্ত্রী পরিষদের সকল সদস্যবৃন্দ ও জাতীয় সংসদের সকল সংসদ সদস্যদের পড়া উচিৎ এবং সরকারকে এর একটি সুন্দর সহনশীল সঠিক জবাব দেয়া উচিত। মুসলমান, হিন্দু, খৃষ্টান, বৌদ্ধসহ সকল সম্প্রদায়ের লোক ঐক্যবদ্ধ হয়ে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি রক্ষা করার জন্য সভা সমাবেশ, মিছিল, আলোচনা সভা, সেমিনার, সেম্পুজিয়ামসহ সবধরনের প্রচেষ্টা চালানো উচিৎ। কারণ বইয়ের বক্তব্য নিয়ে ইদানিংকালে পত্র-পত্রিকা, টেলিভিশনের টকশো, ইলেক্ট্রনিক মিডিয়া, ফেইসবুকসহ সব গণমাধ্যমে ব্যাপক আলোচনা-পর্যালোচনা হচ্ছে।
তিনি সংসদ সদস্যদের প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলেছেন, ডাঃ কালিদাস বৈদ্যের বইটিতে পবিত্র কুরআনের আয়াতের অপব্যাখ্যা করে মহান স্বাধীনতা সংগ্রামকে নিয়ে মিথ্যাচারের জন্য বিষয়টি জাতির পক্ষ থেকে, ইসলামের পক্ষ থেকে এবং এদেশের মুসলমানদের পক্ষ থেকে জাতীয় সংসদে উত্থাপন করবেন, আলোচনা করবেন এবং নিন্দা প্রস্তাব গ্রহণের জন্য দাবি জানান।
তিনি বলেন, ডাঃ কালিদাস বৈদ্যের বই ‘বাঙালির মুক্তিযুদ্ধে অন্তরালের শেখ মুজিব’ এর পাতায় পাতায় হিংসা-বিদ্বেষ-ঘৃণা ছড়ানো মিথ্যা আপত্তিকর ও স্পর্শকাতর বক্তব্য আছে। বাংলাদেশের মুসলমানদেরকে ঘৃণ্য নিকৃষ্ট ও ধিকৃত করার এমন কোনো বক্তব্য নেই যা ডাঃ কালিদাস বৈদ্য তার বইয়ে করেননি।
১৯৭১ সালে আমাদের স্বাধীনতা যুদ্ধ, বঙ্গবন্ধুসহ বিভিন্ন প্রেক্ষাপটে অনেক আপত্তিকর ও স্পর্শকাতর বক্তব্য আছে, যা আমাদের আলোচ্য বিষয় নয়। বাংলাদেশ মুসলমান, হিন্দু, বৌদ্ধ, খৃষ্টান সকলের। আমরা সবাই ভাই ভাই, সকলে মিলে মিশে এদেশে থাকতে চাই। আমাদের মাঝে এই বইয়ে পবিত্র কোরআন মজীদের আয়াতের অপব্যাখ্যার দ্বারা কোনোরূপ রাজনৈতিক, সামাজিক বা সাম্প্রদায়িক অসহিষ্ণুতা যাতে সৃষ্টি না হয়, এ ব্যাপারে আমাদের সকলকে সচেতন থাকতে হবে।
এজন্য বাংলাদেশের আলেম-ওলামা, পীর-মাশায়েখ, মসজিদের ইমাম-খতীব, ইসলামী রাজনৈতিক দলগুলির নেতাকর্মীসহ প্রত্যেক মুসলমানের উচিৎ ও ঈমানী দায়িত্ব হচ্ছে, কোরআন মজীদের এই অপব্যাখ্যাকৃত আয়াতগুলির সঠিক ব্যাখ্যা প্রত্যেকেই নিজ নিজ অবস্থানে জুম‘আর বয়ানে, ওয়াজ মাহফিলে তুলে ধরে জনগণকে সচেতন করা।