ভারতে পুলিশের সামনে ‘জয় শ্রী রাম’ স্লোগান দিয়ে মসজিদের মিনার ভাংছে হিন্দু সন্ত্রাসীরা (ভিডিও)

ইসলামী জার্নাল : ভারতের কেন্দ্রীয় ক্ষমতাসীন দল ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি) শাসিত মধ্যপ্রদেশের কয়েক জায়গায় সাম্প্রদায়িক সহিংসতার ঘটনায় রাজ্যজুড়ে চরম উত্তেজনা বিরাজ করছে।

মন্দাসৌর ও ইন্দোর জেলার কয়েকটি অংশে বিধিনিষেধ জারি করেছে কর্তৃপক্ষ।

সহিংসতায় জড়িত থাকার অভিযোগে এ পর্যন্ত কয়েক ডজন মানুষকে গ্রেফতার করা হয়েছে। উত্তরাঞ্চলীয় রাজ্য উত্তরপ্রদেশের অযোধ্যায় রাম মন্দির নির্মাণের তহবিল সংগ্রহের জন্য ডানপন্থী হিন্দু সংগঠনের আয়োজিত র‌্যালি থেকে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়েছিল বলে জানা গেছে।

মঙ্গলবার ইন্দোর জেলার একটি মুসলিম অধ্যুষিত গ্রামে সংঘর্ষের সূত্রপাত হয়। র‌্যালিতে অংশগ্রহণকারী হিন্দু সংগঠনের সদস্যরা একটি মসজিদের সামনে থেমে উস্কানিমূলক স্লোগান দিতে থাকে। মসজিদে তখন মুসল্লিরা নামাজ পড়ছিলেন। এ ঘটনা থেকে সহিংসতা শুরু হয়।

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভাইরাল হওয়া একটি ভিডিওতে দেখা যায়, গেরুয়া পতাকাবাহী একটি গোষ্ঠী মসজিদের উপরে উঠে ‘জয় শ্রী রাম’ বলে স্লোগান দিচ্ছে এবং পুলিশের উপস্থিতিতেই মসজিদের একটি মিনার ভাঙ্গার চেষ্টা করছে।

পুলিশের মহাপরিদর্শক যোগেশ দেশমুখ এ বিষয়ে বলেন, ‘ঘটনাটি লজ্জাজনক এবং হামলাকারীদের শনাক্ত করার জন্য একটি টিম গঠন করা হয়েছে।’

তিনি বলেন, ‘হামলাকারীদের তুলনায় পুলিশ সংখ্যায় কম ছিল। ফলে তারা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করতে ব্যর্থ হয়’।

দেশমুখ বলেন, যেহেতু এই ঘটনায় পুলিশের জড়িত থাকার বিষয়টি আসছে, তাই ‘আমরা বিষয়টি তদন্ত করছি। যদি এর কোনো প্রমাণ বা ভিডিও পাওয়া যায়, তবে আমরা কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করব।’

পুলিশের মহাপরিদর্শক জানান, সহিংসতায় জড়িত থাকার অভিযোগে এখন পর্যন্ত ২৯ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে।

মাত্র তিন দিন আগে উজাইনের মুসলিম অধ্যুষিত বেগমবাগ এলাকায় একই ধরণের সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। ওই অঞ্চলে বিজেপির যুব সংগঠন ভারতীয় জনতা যুব মোর্চা (বিজেওয়াইএম) আয়োজিত একটি র‌্যালি থেকে পাথর নিক্ষেপ করলে সংঘর্ষ ছড়িয়ে পড়ে।

উজাইন জেলায় প্রথম সংঘর্ষের ঘটনাটি ঘটে ২৫ ডিসেম্বর। সেখানে বিজেওয়াইএম সদস্যরা প্রস্তাবিত অযোধ্যা রাম মন্দিরের জন্য তহবিল সংগ্রহ করতে একটি মোটরসাইকেল র‌্যালি বের করে।

বেগমবাগের এক বাসিন্দা অভিযোগ করেন, বিজেওয়াইএম কর্মীরা দিনের বেলায় একাধিকবার একটি এলাকার পাশ দিয়ে মিছিল করে যাওয়ার সময় কিছু স্থানীয়কে গালি দেয়।

উজাইনের মুসলিম নেতা খালিকুর রেহমান বলেন বলেন, ‘তারা গালিগালাজ করে স্থানীয়দের উস্কে দিচ্ছিল।

দিনে কয়েক হাজার বাইকচালক একাধিকবার ওই এলাকা পার হয় এবং প্রতিবারই তারা স্থানীয় ও পথচারীদের বাজে মন্তব্য করতে থাকে।

ক্রমাগত উস্কানির ফলে ক্ষুব্ধ হয়ে উঠে স্থানীয় জনগণ। এক পর্যায়ে উভয় পক্ষের মধ্যে পাথর ছোঁড়াছুড়ি হয়। এই ঘটনায় অনেক বাসিন্দাদের গাড়ি-বাড়ি ও হাসপাতালের ক্ষয়ক্ষতি হয়।’

এছাড়া, মঙ্গলবার চন্দনপুর থেকে প্রায় ১০০ কিলোমিটার (৬২ মাইল) দূরে মন্দাসৌর জেলার দোরানা গ্রামে একটি গোষ্ঠী স্থানীয় একটি মসজিদের মিনার ভাঙচুরের চেষ্টা করেছে বলে জানা গেছে।

সংশ্লিষ্ট জেলাগুলোতে ১০০ জনের বিরুদ্ধে রিপোর্ট তৈরী করেছে পুলিশ। গ্রেফতার করা হয়েছে প্রায় ৫০ জনকে।

১৯৯২ সালে গুড়িয়ে দেয়া ষোড়শ শতাব্দীর বাবরি মসজিদের জায়গায় রাম মন্দির নির্মাণের জন্য ভারতের বিভিন্ন রাজ্যে বেশ কয়েকটি ডানপন্থী হিন্দু সংগঠন তহবিল সংগ্রহ শুরু করেছে।

ভারতীয় সুপ্রিম কোর্ট বাবরি মসজিদের জায়গায় একটি হিন্দু মন্দির নির্মাণের জন্য সরকার-পরিচালিত একটি ট্রাস্টকে দায়িত্ব দেয়। এর পরিবর্তে একটি মসজিদ নির্মাণের জন্য মুসলমানদের বিকল্প জায়গায় ৫ একর (২ হেক্টর) জমি বরাদ্দ দেয়।

বুধবার বিরোধী সর্বভারতীয় মজলিস-ই-ইত্তেহাদুল মুসলিমীন দলের প্রধান আসাদুদ্দিন ওয়াইসি তার সমর্থকদের উস্কে দেয়ার জন্য সরকারকে দোষারোপ করেন।

তিনি বলেন, ‘এই ব্যক্তিদের উগ্রতা দমনের জন্য সরকার কী পদক্ষেপ নিয়েছে? ধর্মান্তর ও বিয়ে সম্পর্কিত নতুন আইন প্রণয়নের মাধ্যমে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সরকার সংখ্যাগরিষ্ঠ সম্প্রদায়কে উগ্র করে তুলছে।’

মধ্যপ্রদেশের ক্ষমতাসীন বিজেপির রজনীশ আগ্রাওয়াল অবশ্য বলেছেন, যেই অপরাধ করুক না কেন ধর্ম নির্বিশেষে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হবে।

আগ্রাওয়াল বলেন, ‘আমাদের সরকার আইনের শাসন অনুযায়ী কাজ করে। যারা সহিংসতায় জড়িত হয়েছে ও আইন ভঙ করেছে, আইনের আওতায় এনে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হবে।’

তিনি বলেন ‘আমরা কাউকে আইনশৃঙ্খলা নষ্ট করতে দেব না, মধ্যপ্রদেশে কেউ সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা ছড়ানোর অনুমতি পাবে না। আর এটা নিয়ে কারো রাজনীতি করা উচিত নয়’।

‘দায়মুক্তির সংস্কৃতি’
বছরজুড়ে ভারতে ডানপন্থী হিন্দু সংগঠনের সদস্যরা সংখ্যালঘুদের বিভিন্ন ধর্মীয় স্থান ভাঙচুর করেছে।

ফেব্রুয়ারিতে ভারতের রাজধানী নয়াদিল্লির কয়েকটি অংশে দাঙ্গা ছড়িয়ে পড়লে হিন্দুত্ববাদীরা বেশ কয়েকটি মসজিদ ভাঙচুর করে।

দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক অপুরবানান্দ বলেন, ‘এখন ভারতে দায়মুক্তির একটি সংস্কৃতি চালু হয়েছে।’
তিনি আরো বলেন, ‘বিজেপি শাসিত সবক’টি রাজ্যেই আমরা একই রকম ঘটনার বৃদ্ধি দেখতে পাব।’

তিনি বলেন ‘জনগণকে খোলা লাইসেন্স দেয়া হচ্ছে … তারা জানে যে তাদের কিছু হবে না। এবং প্রশাসন নির্লজ্জভাবে এদের পক্ষ নিচ্ছে।’