হেফাজতের নতুন কমিটিতে রদবদল
সিন্ডিকেট, পদোন্নতি পদায়ন নিয়ে কিছু কথা

অনেক ঝড় তুফানের পর হেফাজতে ইসলামের নতুন কমিটি হয়েছে। কমিটি গঠনের আগে পরে অনেক ষড়যন্ত্র হয়েছে। এখনো হচ্ছে। এমন কঠিন সময়ে নতুন পথচলার মাত্র এক মাসের মাথায় আবারও হোচট খেলো হেফাজতে ইসলাম। আল্লামা নূর হোসাইন কাসেমী রহ. এর মতো ব্যক্তির বিকল্প খুঁজতে হয়েছে। তিনি ছিলেন এমন ব্যক্তি, যার শূন্যস্থান পূরণ করা কারো পক্ষেই সম্ভবপর নয়। হুজুরের দায়িত্বে থাকা পদগুলো শুধু মাত্র বন্টিত হয়েছে চার/পাচঁজনের মধ্যে।

হেফাজত মহাসচিব হিসাবে মাওলানা নূরুল ইসলাম এর নাম গতকাল ঘোষণা করা হয়েছে গতকাল। সঙ্গে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের আরও কিছু আলেমের নাম যুক্ত হয়েছে সংগঠনে। কিছু মানুষের পদ পরিবর্তন হয়েছে। সেই সঙ্গে চট্টগ্রাম মহানগর ও ঢাকা মহানগর সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক এর নাম ঘোষণা করা হয়েছে। এই ঘোষণার পর থেকে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে নানা রকম কথা হচ্ছে, সিন্ডিকেট, পদোন্নতি, পদানত নিয়ে কথা উঠেছে। এ বিষয়ে কিছু আলাপ করা যাক। হেফাজতের কমিটির এই রদবদল নিয়ে আমার অভিব্যক্তি বলি।

১, মহাসচিব হিসেবে দায়িত্বে এসেছেন মাওলানা নূরুল ইসলাম সাহেব। এই পদের জন্য মাওলানা নূরুল ইসলাম সাহেবকে যোগ্যই মনে করি। তিনি বর্তমানে নানা কারণেই গুরুত্বপূর্ণ। হাটহাজারীর মজলিসে শুরা হিসেবে বলিষ্ঠ ভুমিকা রেখে তিনি আলোচনায় এসেছেন। এরপর প্রতিটি সংকটে তিনি হক্কানি উলামায়ে কেরামের পক্ষে ভালো ভুমিকা রাখছেন। তিনি বর্তমানে ঢাকার মুরুব্বিদের মধ্যে অন্যতম। চট্টগ্রামের মানুষ। বেফাকের সহসভাপতি। হেফাজতরেও সম্ভবত সিনিয়র নায়েবে আমীর ছিলেন। তাকে এই পদে দেয়ার সিদ্ধান্ত সঠিকই মনে করি।

২, হটাৎ কেন এত মানুষকে যুক্ত করা হলো এটা একটা প্রশ্ন। – হেফাজতের কমিটি গঠনের দিনই ঘোষণা শুনেছিলাম কমিটিতে আরও কিছু নাম যুক্ত হবে। সে হিসেবেই দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে আলেম উলামাদের যুক্ত করা হয়েছে। এছাড়াও জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম থেকে অনেক বেশি লোক কমিটিতে ঢুকেছে এই অভিযোগ ছিলো। সেজন্যই অন্য দলগুলো থেকে আরও লোক নিয়ে ব্যলেন্স করার চেষ্টা হয়েছে বলে মনে হয়।

৩, সবচেয়ে বেশি আপত্তি ঢাকা মহানগর সভাপতি মাওলানা জুনায়েদ আল হাবিব সাহেব কে নিয়ে। আল্লামা নূর হোসাইন কাসেমী সাহেব এর উত্তরসূরী হিসেবে সিনিয়র কাউকে বসানো গেলেই ভালো হতো। আর শাপলা চত্বর ট্রাজেডির ব্যাপারে শুনি, তিনি লন্ডন গিয়েছেন এটা সত্য। তবে খলনায়ক ছিলেন না। অন্য অনেকের মতো তিনিও আত্ম গোপন করেছিলেন। কিন্তু কথা হলো, এত অভিযোগ যেহেতু আছে, তিনি এখন এর একটা ব্যাখ্যা দিতে পারেন। লাইভের মাধ্যমে অথবা লেখার মাধ্যমে বাস্তবতা তুলে ধরা জরুরি মনে করি।

৪. মাওলানা সাখাওয়াত হোসেন রাজী কে সহ সাংগঠনিক সম্পাদক থেকে সহকারী মহাসচিব করা হয়েছে এটা একটা সুন্দর সিদ্ধান্ত। আরও চারজনকে সহকারী মহাসচিব থেকে যুগ্ম মহাসচিব করা হয়েছে। এখানে অনেকের আপত্তি দেখলাম। দুঃখজনক হলেও সত্য আমাদের দল অনেক। চাহিদাও অনেক। সেজন্যই এখানে পদোন্নতি নয়, পদ পরিবর্তন হয়েছে। আর মাওলানা ফজলুল করিম কাসেমী, মাওলানা হাবিবুল্লাহ মিয়াজি, মাওলানা শফিকউদ্দীন কে মেনে নিয়ে শুধুমাত্র মাওলানা খালেদ সাইফুল্লাহ আইয়ুবী কে নিয়ে আপত্তি যুক্তিসঙ্গত মনে হয় না। অতীতের ত্যাগও দেখতে হবে। সঙ্গে বর্তমানের ভূমিকাও গুরুত্বপূর্ণ।

৫, মাওলানা হারুন ইজহার সাহেব। সম্ভাবনাময় আলেম। কেউ মানুক আর না মানুক তিনি চট্টগ্রামের একজন প্রভাবশালী ব্যক্তিত্ব। হারুন সাহেব এর চেয়ে অযোগ্য অনেকে বড় পদে আছেন। হারুন সাহেবকে আরও গুরুত্বপূর্ণ জায়গায় আনতে পারলে ভালো হতো। ঠিক তেমনই হারুন সাহেব গতকাল যে প্রতিক্রিয়া দিয়েছেন বৃহত্তর কল্যানের অনলাইলে এড়িয়ে অফলাইনে তৎপর হলেই হয়তো ভালো হতো। এবং তিনি সেই ভূমিকা রাখতে সক্ষম বলেই জানি।

৬, অভিযোগ উঠেছে সিন্ডিকেট এর। এটা খুবই হতাশাজনক। মহাসচিব মনোনয়নের মিটিং এ যাদের নাম দেখলাম সবাই হেফাজতের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বশীল। আমির, উপদেষ্টা, নায়েবে আমির, যুগ্ম মহাসচিব, সহকারী মহাসচিব ও সম্পাদকবৃন্দই ছিলেন মিটিং এ। তবুও কেন সিন্ডিকেট বলা হচ্ছে? মিটিং এ সবাই ছিলেন না-এটা হয়তো কারণ। কিন্তু বাস্তবতা হলো, এত বড় কমিটির সবাইকে নিয়ে সিদ্ধান্ত নেয়া সম্ভব না।

তারপরও হেফাজতের নতুন কমিটিকে সিন্ডিকেটের অভিযোগ থেকে মুক্ত থাকতে হবে। কারণ সবার অনেক আবেগ এই কমিটি নিয়ে। এক সিন্ডিকেট থেকে মুক্ত হয়ে আরেক সিন্ডিকেট এর কবলে কেউ পরতে চায় না। এজন্য হেফাজত কে একটা নীতিমালা করতে হবে। নিয়মিত ও তৎক্ষনাৎ সিদ্ধান্তের জন্য উচ্চ ক্ষমতা সম্পন্ন একটা শুরা বা খাস কমিটি রাখতে হবে। যাতে করে তারা সিদ্ধান্ত গুলো নিতে পারে। এবং কোনো সিন্ডিকেট যাতে তৈরি না হয়।

শেষ কথা হলো, সবাই কে সন্তুষ্ট করে কমিটি করা অসম্ভব। কিছু ভুল ত্রুটি আছে, থাকবে। চেষ্টা করতে হবে ভুল যত কমানো যায়। হেফাজতের নতুন কমিটি গঠনের সময় যাদেরকে নাম বাদ পড়েছে তাদের মধ্যে যাদেরকে নেয়া সম্ভব তাদের নেয়া যেতে পারে। মুফতি ওয়াক্কাস সাহেবকে আরও কাছে টানা দরকার। তিনি যদিও কিছু ভুল করেছেন তবুও মুফতি ওয়াক্কাস সাহেবকে অন্যদের মত মনে করি না। জমিয়তের ঐ পক্ষ থেকেও সদস্য বাড়ানো যেতে পারে। এভাবেই আমাদের দূরত্ব কমাতে হবে। বর্তমান সময়টা কতটুকু নাজুক এটাও মনে রাখতে হবে। ইসলাম বিদ্বেষী শক্তি এখন আলেম উলামাদের পিছনে কিভাবে লেগেছে এটা কারো কাছে অস্পষ্ট নয়। এই কঠিন সময়ে আমাদের ঐক্যবদ্ধ হতে হবে। বিভক্ত নয়।