দেশের ভালোবাসা বুকে লালন করে রাজনীতি করি: একান্ত সাক্ষাৎকারে চরমোনাই পীর

সৈয়দ মুহাম্মদ রেজাউল করিম (১ ফেব্রুয়ারি ১৯৭১) পীর সাহেব চরমোনাই নামে অধিক পরিচিত। তিনি একজন আলেম, রাজনীতিবিদ, শিক্ষাবিদ, ধর্মীয় আলোচক।
বর্তমানে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের দ্বিতীয় আমীর হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। এছাড়াও তিনি বাংলাদেশ মুজাহিদ কমিটি ও বাংলাদেশ কোরআন শিক্ষা বোর্ডের সভাপতি এবং বেফাকুল মাদারিসিল আরাবিয়া বাংলাদেশের সহ-সভাপতি।

মুফতি রেজাউল করিম দুই মেয়াদে চরমোনাই ইউনিয়নের চেয়ারম্যানও ছিলেন। তার নেতৃত্বে জোট-মহাজোটের বাইরে স্বতন্ত্র ধারার তৃতীয় শক্তি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করতে চাইছে ধর্মভিত্তিক এ রাজনৈতিক দলটি।
ইসলামি রাজনীতি, হেফাজত আন্দোলনসহ দলীয় নানান বিষয় নিয়ে যুগান্তরের পক্ষ থেকে তার মুখোমুখী হয়েছিলেন- এহসান সিরাজ ও মনযূরুল হক। গ্রন্থনা করেছেন- তানজিল আমির।
যুগান্তর: সদ্যপ্রয়াত আল্লামা আহমদ শফী (রহ.) সম্পর্কে আপনার মূল্যায়ন জানতে চাই।
সৈয়দ রেজাউল করিম: তিনি তো বাংলাদেশের শীর্ষস্থানীয় একজন আলেমে দীন এবং সর্বোচ্চ শ্রদ্ধাভাজন ব্যক্তিত্ব ছিলেন। হজরতের সঙ্গে আমার ভালো সম্পর্ক ছিল। তিনি আমার জন্য সব সময় দোয়া করতেন।

যুগান্তর: হেফাজতে ইসলামে’র আন্দোলন নিয়ে আপনার মতামত কী?
সৈয়দ রেজাউল করিম: হেফাজতে ইসলাম হলো একটি অরাজনৈতিক সংগঠন। আর আমরা যেহেতু রাজনৈতিক সংগঠন, তাই কিছুটা পার্থক্য তো থাকবেই। তারা অনৈসলামিক কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে তৎপর। এ-কারণে কোনও কোনও ইস্যুতে সব ধরনের দল তাদের ব্যানারে এসে কাজ করে।

যুগান্তর: কওমি ধারার প্রায় সব রাজনৈতিক দলই তো হেফাজতে একীভূত হয়ে গেছে। এই দলগুলোর নেতারাই হেফাজতে ইসলামের নেতা। একমাত্র ইসলামী আন্দোলন এর বাইরে। কারণ কী?
সৈয়দ রেজাউল করিম: যতগুলো ইসলামী দল আছে, যারা এখন সমমনা নামে নিজেদের প্রকাশ করছে। বাস্তবতা হলো- তাদের অনেক দলই এমন আছে যারা, বিএনপি, আওয়ামীলীগ, জাতীয় পার্টিসহ যেসব দল চিন্তা-চেতনায় মানব রচিত আইন লালন করে, যা ইসলাম সমর্থিত নয়-রাজনৈতিকভাবে তাদের সঙ্গেও জোটবদ্ধভাবে কাজ করে যাচ্ছে।
আর আমরা শুরু থেকেই একটা কথা বলে আসছি, একমাত্র আল্লাহ ও রাসূলের (সা.) নীতি-আদর্শ নিয়েই আমরা রাজনীতি করব। মূলত পার্থক্যটা এখানেই।

যুগান্তর: কওমি ধারার যতগুলো জোট বিভিন্ন সময় থেকে আন্দোলন করে আসছে, বিশেষ করে চারদলীয় জোটের আন্দোলন, স্বীকৃতি নিয়ে শাইখুল হাদীসের (রহ.) মুক্তাঙ্গনের আন্দোলন, আর সর্বশেষ হেফাজতের আন্দোলন- এই তিন সময়েই আপনারা আলাদাভাবে আন্দোলন করেছেন, তাদের সঙ্গে নয়। কেন?
সৈয়দ রেজাউল করিম: সেই সময়গুলোতে আমি অতটা সক্রিয় ছিলাম না। তাই ভালো বলতে পারব না। তারপরও যতটুকু শুনেছি, প্রত্যেক দলই নিজ ব্যানারে থেকেই আন্দোলনে শরীক হয়েছিল, এটাই বাস্তবতা। আর হেফজত আন্দোলনের বিষয়ে তো বললামই।

যুগান্তর: হেফাজতের ১৩ দফা কি আপনি সমর্থন করেন?
সৈয়দ রেজাউল করিম: হেফাজতের ১৩ দফার মধ্যে কিছু কিছু বিষয় আমার কাছে খুবই অসম্ভব বলে মনে হয়েছে। এছাড়া সবগুলোই আমি সমর্থনযোগ্য বলে মনে করি।

যুগান্তর: অসম্ভব কোনগুলো? ধর্ম অবমাননায় সর্বোচ্চ শাস্তির বিধান নাকি নারী নীতিমালা কেন্দ্রীক দাবীগুলো?

সৈয়দ রেজাউল করিম: না, এগুলো ঠিক আছে।

যুগান্তর: গণতন্ত্রের প্রতি আপনাদের আস্থা কতটুকু?
সৈয়দ রেজাউল করিম: আসলে গণতন্ত্র একটি ব্যাপক ব্যাখ্যা সাপেক্ষ শব্দ। সাধারণ অর্থে বললে, সব মানুষের সমর্থনকে বুঝায়।
কিন্তু প্রচলিত গণতন্ত্রে সেটা পাওয়া যায় না। ইসলাম গণতন্ত্রের এ অংশটুকু কিছুটা সমর্থন করে। যেখানে গণমানুষের সমর্থন থাকবে, প্রত্যেকের বাকস্বাধীনতা থাকবে। এখনকার গণতন্ত্র তো শুধুই মুখে, বাস্তবে নেই।

যুগান্তর: আপনারাও তো প্রচলিত গণতন্ত্রে গা ভাসিয়েছেন?
সৈয়দ রেজাউল করিম: না, না, আমাদের নীতি আদর্শ সম্পূর্ণ ইসলাম কেন্দ্রীক। আমরা সেটাই বাস্তবায়নের চেষ্টা করে যাচ্ছি।

যুগান্তর: কিন্তু আপনারা তো নির্বাচনে অংশ নিচ্ছেন। প্রচলিত গণতান্ত্রিক পদ্ধতি অনুযায়ী তাদের সব নিয়ম মেনে ভোট করছেন। এটা কি ইসলাম সমর্থন করে?
সৈয়দ রেজাউল করিম: গণতন্ত্র আর নির্বাচন এক বিষয় নয়। বিশ্বে এমন অনেক অগণতান্ত্রিক রাষ্ট্রেও নির্বাচন হয়। আমাদের তো এবার বেফাকের সভাপতিও নির্বাচনের মাধ্যমে হয়েছে।
তাছাড়া আমাদের বাংলাদেশে আমরা যে কাপড় পরি, এটাও কিন্তু সুদভিত্তিক ব্যবসার মধ্য দিয়েই আসছে। আমরা আসলে পরিস্থিতির শিকার। এই পরিস্থিতি বদলানোর জন্যই তো আমাদের আন্দোলন।

যুগান্তর: তবে কি আপনারা ভাবছেন এই প্রচলিত ধারাতেই ক্ষমতায় যেতে পারবেন? এবং সবকিছু বদলাতে পারবেন?
সৈয়দ রেজাউল করিম: বাংলাদেশের ৯২ ভাগ মানুষ মুসলমান। প্রত্যেক মুসলমানের দায়িত্ব হলো ইসলামের পক্ষে থাকা। সেই দৃষ্টিকোণ থেকে তো আমরা এতটুকু আশা করতেই পারি।

যুগান্তর: ইসলামী আন্দোলন তো একটা দল মাত্র। সবাই  আপনাদের ভোট না-ও দিতে পারে। অন্য কোনও ইসলামী দলকেও দিতে পারে। তাহলে আপনারা কেন এককভাবে পারবেন বলে মনে করছেন?
সৈয়দ রেজাউল করিম: আসলে অন্যান্য ইসলামী দলগুলো যখন বিএনপি-আওয়ামীলীগের সঙ্গে জোটবদ্ধ হয়ে কাজ করে, তখন আর ইসলামের স্বকীয়তা বলতে কিছু থাকে না। আমরা মূলত সেই স্বকীয়তা ধরে রাখার চেষ্টা করে যাচ্ছি৷

যুগান্তর: একটা সময় তো আপনারাও জোটবদ্ধ হয়ে কাজ করেছেন ?
সৈয়দ রেজাউল করিম: হ্যাঁ, করেছি। তখন আমাদের আলাদা শর্ত ছিল। আমরা শর্ত অনুযায়ী কাজ করেছি। অন্যরা সেসব শর্ত মেনে আমাদের সঙ্গে কাজ করেছে।

যুগান্তর: হরতাল সম্পর্কে আপনার অবস্থান কী?
সৈয়দ রেজাউল করিম: ভাঙচুরের রাজনীতি ইসলাম সমর্থন করে না। আমরাও সবসময় এই বিষয়গুলো এড়িয়ে চলার চেষ্টা করি।

যুগান্তর: কখনও কখনও তো আপনাদেরও হরতাল করতে দেখা গেছে?
সৈয়দ রেজাউল করিম: মূলত বাংলাদেশে দাবি আদায়ের ক্ষেত্রে হরতালের একটা প্রচলন আছে। সেই ধারাবাহিকতায় আমরাও কখনও কখনও হরতাল করেছি। তবে আমাদের হরতাল অন্যদের থেকে আলাদা, শান্তিপূর্ণ।
আমরা হয়তো বলি, সব বন্ধ থাকবে। কিন্তু ভাঙচুরের ইতিহাস আমাদের নেই, আমরা এটা পছন্দও করি না।

যুগান্তর: বিএনপি’র আমলে আপনাদের বিরুদ্ধে একবার রায় হয়েছিল, তখন আপনি জেলে ছিলেন। সে সময় আপনাদের কর্মীরা গাড়ি ভাঙচুর করেছিল, এ ব্যাপারে আপনি কী বলবেন?