খুলনায় করোনা রোগীর চাপ বৃদ্ধি: চিকিৎসক ও ওষুধ সংকট

শীতের শুরুতে খুলনায় বাড়ছে করোনার প্রভাব। প্রতিদিনই খুলনা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের ফ্লু-কর্নার ও আইসোলেশন ওয়ার্ডে বাড়ছে করোনা রোগী। রোগীর চাপ সামলাতে ইতোমধ্যে খুলনা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল ও খুলনা জেনারেল হাসপাতালে শয্যা প্রস্তুত রাখা হয়েছে। এছাড়া মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের আইসিইউ ভবনে প্রত্যাশিত লিকুইড অক্সিজেন প্লান্ট চালুর প্রক্রিয়া চলছে। তবে সরকারি হাসপাতালে প্রয়োজনীয় চিকিৎসক-স্বাস্থ্যকর্মীর ঘাটতি এবং ওষুধের সংকট রয়েছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে।
খুলনায় প্রধানত মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল এবং করোনা ডেডিকেটেড হাসপাতালে করোনা রোগীর সেবা দেওয়া হয়। করোনার প্রথম দফায় ৩৯তম বিসিএস এর মধ্যে দিয়ে খুলনায় ২৪ জন চিকিৎসক যোগ দেন। কিন্তু চিকিৎসা দিতে গিয়ে অসুস্থতা ও চিকিৎসকদের মধ্যে অন্তঃসত্ত্বা মা থাকায় তাদের অনেককে কাজে লাগানো যাচ্ছে না । জরুরি মুহূর্তে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স থেকে চিকিৎসক এনে সেবা চালানো হয়েছে।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, খুলনা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের ফ্লু-কর্নার ও আইসোলেশন ওয়ার্ডে গত কয়েকদিনে রোগীর সংখ্যা বাড়ছে। গত সপ্তাহে ওয়ার্ডে রোগীর সংখ্যা কম ছিল। খুলনা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে লিকুইড অক্সিজেন প্লান্ট এবং কমপ্রেসড এয়ার মেশিন না থাকায় করোনা রোগীদের সেবা দেওয়ার জন্য পর্যাপ্ত হাই-ফ্লো ন্যাজাল ক্যানোলা থাকলেও তা সঠিকভাবে ব্যবহৃত হচ্ছে না। ফলে রোগীরা কাঙ্ক্ষিত সেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।

জানা গেছে, করোনা রোগীর নিরবচ্ছিন্ন ও উচ্চমাত্রায় অক্সিজেন সরবরাহ করার জন্য সরকার সারাদেশে জরুরি ভিত্তিতে লিকুইড অক্সিজেন প্লান্ট স্থাপনের উদ্যোগ নিয়েছে। খুলনা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল ও খুলনা জেনারেল হাসপাতালেও এ প্লান্ট দেওয়া হয়েছে। কিন্তু খুলনার এ দুটি হাসপাতালে অক্সিজেন প্লান্ট এখনও স্থাপিত হয়নি। এ কারণে করোনার দ্বিতীয় ধাক্কায় দক্ষিণ পশ্চিমাঞ্চলের জনগোষ্ঠীর করোনার চিকিৎসা নিয়ে শঙ্কা দেখা দিয়েছে।
দিঘলিয়ার এক রোগীর স্বজন মো. বাবু জানান, করোনার উপসর্গ নিয়ে আসা তার বাবার শ্বাসকষ্ট রয়েছে। তবে হাসপাতালে আসার পর অক্সিজেন দেওয়ায় কিছুটা ভালো হয়।
সাতক্ষীরার কলারোয়া থেকে আসা মো. ফাহিম জানান, তার নানি করোনা পজিটিভ হওয়ায় ফ্লু-কর্নারে চিকিৎসা নিচ্ছেন। তাকে অক্সিজেন দেওয়া হচ্ছে।
ফ্লু-কর্নারের দায়িত্বে থাকা মো. জুম্মান বলেন, ‘এখানে সিলিন্ডারের মাধ্যমে অক্সিজেন সরবরাহ করা হচ্ছে। পর্যাপ্ত অক্সিজেন মজুত আছে।’
ফ্লু-কর্নারের দায়িত্বপ্রাপ্ত খুলনা মেডিক্যাল কলেজের আরএমও ডা. মো. মিজানুর রহমান বলেন, ‘শীতের শুরুতে করোনা রোগী কিছুটা বেড়েছে। করোনার উপসর্গ নিয়ে যেসব রোগী ফ্লু-কর্নারে আসছেন, তাদের সংখ্যা বাড়লেও করোনা পজিটিভের সংখ্যা খুব বেশি বাড়েনি।’ তিনি বলেন, ‘এখানে অক্সিজেন সংকট আছে। লিকুইড অক্সিজেন প্লান্ট  স্থাপন করতে পারলে এ সমস্যা দূর হবে।’
এই চিকিৎসক আরও বলেন, ‘আমাদের ভেন্টিলেটর চালানোর জন্য প্রয়োজনীয় কমপ্রেসড এয়ার মেশিনও এখানে নেই। বর্তমানে ভেন্টিলেটর চালানো হচ্ছে সিলিন্ডার অক্সিজেনের মাধ্যমে। কমপ্রেসড এয়ার মেশিন স্থাপনের জন্য ইতোমধ্যে মন্ত্রণালয়ে চিঠি দেওয়া হয়েছে।’
বাংলাদেশ মেডিক্যাল অ্যাসিয়েশন, খুলনার সাধারণ সম্পাদক খুলনা মেডিক্যাল কলেজের উপাধ্যক্ষ ডা. মেহেদী নেওয়াজ জানিয়েছেন, খুমেক হাসপাতালে লিকুইড অক্সিজেন প্লান্ট ডিসেম্বরে চালুর সম্ভাবনা রয়েছে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দেওয়া এই অক্সিজেন প্লান্ট স্থাপনের কাজ চলছে। এ প্লান্ট স্থাপন হলেই খুমেক হাসপাতালের ফ্লু কর্নারের দোতলায় ৪০ বেডের আইসিইউ স্থাপন করা হবে। করোনার শুরুতে খুলনায় এ সংখ্যা ছিল ১০টি। তিনি বলেন, ‘খুলনায় এখন করোনা চিকিৎসার জন্য ২৯টি হাই ফ্লো রয়েছে। শুরুতে এ সংখ্য ছিল ১০টি। আর অক্সিজেন সাপোর্ট বেড রয়েছে ২৪টি। করোনার শুরুতে খুলনায় এ সাপোর্ট ছিল মাত্র ১০টি।’
ডা. মেহেদী নেওয়াজ বলেন, ‘শীতে করোনার দ্বিতীয় ঢেউ মোকাবিলায় প্রধানমন্ত্রী সজাগ রয়েছেন। এ কারণে সারাদেশে চিকিৎসা ব্যবস্থার ওপর বিশেষ নজর দিয়েছেন। এর ধারাবাহিকতায় খুলনায়ও করোনা চিকিৎসায় প্রয়োজনীয় উপকরণ সরবরাহ করা হয়েছে।’
ডা. নেওয়াজ আরও বলেন, ‘যেহেতু খুলনা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে লিকুইড অক্সিজেন প্লান্ট তৈরি হচ্ছে, এ কারণে করোনা চিকিৎসায় এখানে শয্যা সংখ্যা বাড়ানো হচ্ছে। যদি গতবারের থেকে রোগী বাড়ে, তাহলে দুই জায়গায় একই চিকিৎসক দিয়ে নিয়ন্ত্রণ কঠিন হয়ে যাবে। সে ক্ষেত্রে অতিরিক্ত ২০ জন চিকিৎসক প্রয়োজন হবে। এছাড়া সদর হাসপাতালে করোনা চিকিৎসায় আলাদা শয্যা প্রস্তুত রাখা হয়েছে। সেখানে আরও ২০ জন চিকিৎসকের প্রয়োজন হবে। সব মিলিয়ে আরও ৩৫-৪০ জন চিকিৎসক নিয়োগ দেওয়া হলে ভালোভাবে চিকিৎসা দেওয়া সম্ভব হবে।’
খুলনা মেডিক্যাল কলেজের অধ্যক্ষ ডা. আব্দুল আহাদ বলেন, ‘দ্বিতীয় দফার করোনা মোকবিলার সক্ষমতা আমাদের রয়েছে এবং প্রথম দফায় করোনা প্রতিরোদের অভিজ্ঞতা এখানে কাজে লাগানো হবে।’
চিকিৎসকরা জানান, স্বাস্থ্যগত ক্ষেত্রে করোনা রোগীর স্বাস্থ্যসেবা দেওয়ার জন্য হাইফ্লো নেজাল ক্যানোলা ও অক্সিজেন সিলিন্ডার যথেষ্ট আছে। কিন্তু প্রয়োজনীয় চিকিৎসক স্বাস্থ্যকর্মীর সংকট রয়েছে। সেইসঙ্গে ওষুধের ঘাটতিও রয়েছে। সরকারিভাবে করোনা চিকিৎসায় ওষুধ সরবরাহ করা হলে রোগীদের কাছে চিকিৎসাসেবা সাশ্রয়ী হয়ে আসবে। তবে এ বিষয়ে স্বাস্থ্য বিভাগকে জানানো হলেও এখনও পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি।
এদিকে, খুলনার প্রত্যন্ত এলাকায় করোনা চিকিৎসাসেবায় অক্সিজেন সিলিন্ডার ব্যাংক ও হাইফ্লো নেজাল ক্যানোলা স্থাপনের কাজ চলছে। জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ হেলাল হোসেন বলেন, ‘প্রত্যন্ত এলাকার মানুষকে জরুরি সেবা দিতে উপজেলা পর্যায়ে অক্সিজেন ব্যাংক, হাই ফ্লো নেজাল ক্যানোলা স্থাপন করা হচ্ছে। করোনা পরবর্তী সময়ও এই স্বাস্থ্যসেবা অব্যাহত থাকবে। এরই মধ্যে দাকোপ ও ডুমুরিয়া স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে এই সেবা চালুর জন্য দরপত্র আহ্বান করা হয়েছে। বাকি উপজেলাতেও জরুরি স্বাস্থ্যসেবা চালুর জন্য দরপত্র আহ্বান করা হচ্ছে।’